মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগ নিয়ন্ত্রণে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপের পথে হাঁটছে ভারত। দেশটির প্রথম নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ডেঙ্গু টিকা ‘ডেঙ্গিঅল’ বর্তমানে বৃহৎ পরিসরে তৃতীয় ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভারতীয় চিকিৎসা গবেষণা পরিষদ বা আইসিএমআরের প্রধান জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ এই টিকার ট্রায়ালের ফলাফল উন্মোচন করা হতে পারে।
আইসিএমআরের মহাপরিচালক ডা. রাজীব বহেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্যানাসিয়া বায়োটেকের সাথে যৌথভাবে তৈরি এই চতুর্মুখী ডেঙ্গু টিকার তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল দেশজুড়ে সফলভাবে এগিয়ে চলছে। দেশের ২০টি শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১৩ হাজারেরও বেশি সুস্থ স্বেচ্ছাসেবীর ওপর এই র্যান্ডমাইজড কনট্রোলেড ট্রায়াল বা নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। স্বেচ্ছাসেবীদের শরীরে ক্ষতিকারক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া ডেঙ্গু সংক্রমণের বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে প্রায় ১২ মাসের ফলো-আপ বা পর্যবেক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে।
‘ডেঙ্গিঅল’ আসলে কী?
ডেঙ্গিঅল একটি টেট্রাভ্যালেন্ট বা চতুর্মুখী টিকা হিসেবে তৈরি করা হয়েছে, যার লক্ষ্য হলো ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই সুরক্ষা প্রদান করা। প্যানাসিয়া বায়োটেক এটি একটি লাইভ-অ্যাটেনিউয়েটেড বা জীবন্ত দুর্বল করা ভাইরাসের টিকা হিসেবে তৈরি করেছে, যা চারটি স্ট্রেইনের বিরুদ্ধেই নিউট্রালাইজিং অ্যান্টিবডি তৈরিতে উদ্দীপিত করে।
এটি ভারতের প্রথম নিজস্ব একক ডোজের টেট্রাভ্যালেন্ট ডেঙ্গু টিকা হিসেবে বিকশিত হচ্ছে। ডেঙ্গু সৃষ্টিকারী চারটি প্রধান সেরোটাইপ—যেমন DENV-1, DENV-2, DENV-3 এবং DENV-4-এর বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেওয়া এর মূল উদ্দেশ্য। প্রধানত এডিস মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়ায় এবং এর ফলে প্রচণ্ড জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, পেশি ও জয়েন্টে ব্যথা, বমি ভাব এবং গায়ে ফুসকুড়ির মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
টিকাটিকে একক ডোজের টিকা হিসেবেও মূল্যায়ন করা হচ্ছে। যদি এটি ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত হয়, তবে একাধিক ডোজের টিকার তুলনায় একক ডোজের এই টিকা টিকাদান কার্যক্রমের লজিস্টিকস সহজ করবে এবং মানুষের গ্রহণ করার প্রবণতা বাড়াবে। তবে এর নিরাপত্তা, কার্যকারিতা এবং সঠিক ব্যবহার চূড়ান্ত ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করবে। কিছু ক্ষেত্রে ডেঙ্গু মারাত্মক রূপ নিতে পারে, যার ফলে রক্তপাত, শক এবং জীবননাশক জটিলতা দেখা দিতে পারে। বর্তমানে এই সংক্রমণের সুনির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই, যে কারণে মশা নিয়ন্ত্রণ এবং পরবর্তীতে টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত কেন নিজস্ব ডেঙ্গু টিকা তৈরি করছে?
নিউজ ১৮-এর তথ্যমতে, ভারতসহ বিভিন্ন ক্রান্তীয় ও উপ-ক্রান্তীয় অঞ্চলে ডেঙ্গু একটি প্রধান জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে, যেখানে ঋতুভিত্তিক প্রাদুর্ভাবের সময় হাসপাতালগুলোতে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়। মশা নিয়ন্ত্রণ ও অন্যান্য জনস্বাস্থ্যমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি একটি স্থানীয়ভাবে তৈরি টিকা ডেঙ্গু প্রতিরোধে একটি অতিরিক্ত হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে।
একটি নিজস্ব টিকা তৈরি করা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ডেঙ্গু চারটি ভিন্ন ভাইরাস সেরোটাইপ (DENV-1 থেকে DENV-4) দ্বারা ঘটে থাকে। একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে অন্যগুলোর বিরুদ্ধে পূর্ণ সুরক্ষা পাওয়া যায় না।
টিকাটি কবে সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছাতে পারে?
২০২৭ সালের শেষ নাগাদ বাজারে আসার বিষয়টি কোনো নিশ্চিত লঞ্চের তারিখ নয়, বরং এটি একটি সম্ভাব্য সময়সীমা। টিকার প্রাপ্যতা মূলত ট্রায়ালের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে, যেখানে এর গ্রহণযোগ্য নিরাপত্তা প্রাইভাইল এবং পর্যাপ্ত সুরক্ষার বিষয়টি প্রমাণিত হতে হবে। এরপর নিয়ন্ত্রক সংস্থার পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন মিললেই কেবল এটি সম্ভব। সব ঠিকঠাক থাকলে, ভারতের ডেঙ্গু প্রতিরোধের উপকরণের তালিকায় ‘ডেঙ্গিঅল’ একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হতে পারে।
ভারতে ব্যবহারের আগে কী প্রক্রিয়া বাকি রয়েছে?
তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল শেষ হওয়াই মানেই যে টিকাটি সাথে সাথে বাজারে চলে আসবে, বিষয়টি এমন নয়। ব্যাপক ব্যবহারের আগে চূড়ান্ত নিরাপত্তা ও কার্যকারিতার ফলাফলগুলোকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল্যায়নের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। ট্রায়াল যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয় এবং নিয়মকানুনগুলো পূরণ হয়, তবে ভারত ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ তার প্রথম নিজস্ব ডেঙ্গু টিকা পেতে পারে। তত দিন পর্যন্ত মশার কামড় থেকে রক্ষা পাওয়া, জমে থাকা পানি পরিষ্কার করা এবং ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া—এই রোগটির প্রকোপ কমানোর মূল উপায় হিসেবে বহাল থাকছে।


