...|...|...

শিক্ষা

টেস্টে ফেল করলে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণে বাধা, বোর্ডের নিয়মে কী আছে

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, দুপুর ২:৩৯ | আপডেট: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ৭:১৪
Shares
টেস্টে ফেল করলে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণে বাধা, বোর্ডের নিয়মে কী আছে

২০২৫ সালে এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফলের পর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে শিক্ষার্থীরা।

চলতি বছরের এসএসসির ফল প্রকাশের পর নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের শতভাগ জিপিএ-৫ নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা। কারণ, দশম শ্রেণির ৪৮৫ শিক্ষার্থীর মধ্যে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ৩৮২ জন। বাকি ১০৩ জন টেস্ট বা নির্বাচনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারায় তাদের ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ।

স্কুলটির দাবি, বোর্ডের নিয়ম মেনেই অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগ উঠেছে, জিপিএ-৫-এর হার ধরে রাখতে দুর্বল শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি।

অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড স্কুলটির কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। বোর্ড জানতে চেয়েছে- ভর্তি করা শিক্ষার্থী, নবম শ্রেণির নিবন্ধন, নির্বাচনী পরীক্ষা ও এসএসসি ফরম পূরণের তথ্য।

কিন্তু টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করার কারণে কোনো শিক্ষার্থীকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে না দেওয়ার সুযোগ কি একটি স্কুলের রয়েছে? এ বিষয়ে শিক্ষা বোর্ডের নিয়ম কী?

১৫ বছর ধরে পাশের হার শতভাগ এই স্কুলে

২০১২ সাল থেকে টানা ১৫ বছর এসএসসি পরীক্ষায় নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুলের পাসের হার শতভাগ।

এর মধ্যে ২০১৫, ২০১৭, ২০২২ ও ২০২৫ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সব শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিল। চলতি বছরও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে স্কুলটিতে।

এবার স্কুলটি থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩৮২ জনের সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছে।

ওই ১৫ বছরে স্কুলটি থেকে মাধ্যমিকে ট্যালেন্টপুল ও সাধারণে বৃত্তিও পেয়েছে ১৫৩ জন।

স্কুলটির প্রকাশিত ফলাফলের তালিকায় ২০১৫ সালে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে দশম এবং পরবর্তী বিভিন্ন বছরে প্রতিষ্ঠানটিকে 'দেশসেরা' হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।

তারপরও স্কুলটি নিয়ে অভিযোগ কেন

স্কুলটি এখন আলোচনায় আসার কারণ হলো ঢাকা বোর্ডের পাঠানো 'শোকজ'।

গত ১০ই আগস্ট মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস থেকে এবারও শতভাগ পাশ ও জিপিএ-ফাইড পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা হয়।

অনেকেই অভিযোগ করেন, জিপিএ-৫ পাওয়ার হার বাড়ানোর জন্য ও রেকর্ড ধরে রাখার জন্য এই স্কুলে অনেক শিক্ষার্থীকে মাধ্যমিক পরীক্ষাতে বসতেই দেওয়া হয় না।

বিষয়টি ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের নজরে এলে তারা ঘটনার সার্বিক সত্যতা যাচাই এবং প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য জানতে স্কুলকে গত ১৬ই আগস্ট একটি নোটিশ দেয়।

বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক ড. মো. মাসুদ রানা খান স্বাক্ষরিত সেই আদেশে বলা হয়, চলতি বছরের মাধ্যমিক পরীক্ষায় "শতভাগ জিপিএ-৫ অর্জনের জন্য নিয়মবহির্ভূত কৌশল অবলম্বনের অভিযোগ" উঠেছে নাসিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল এন্ড হোমসের বিরুদ্ধে।

এ লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটিতে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীর তথ্য, নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর তথ্য, এসএসসি'র নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর তথ্য এবং এসএসসি পরীক্ষায় ফরমপূরণকৃত শিক্ষার্থীর তথ্যসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র সশরীরে উপস্থিত হয়ে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে উত্থাপিত অভিযোগের কারণ ব্যাখ্যার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ নিয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. ইমন আহমেদের সাথে মঙ্গলবার সারাদিন মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও  তিনি কোনো সাড়া দেননি।

আর স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ কামাল হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা গেলেও তিনি জানিয়েছেন, স্কুলের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এসেছে, তার জবাব স্কুল প্রমাণসহ দিবে। এর চেয়ে বেশি কিছু জানার থাকলে প্রধান শিক্ষকের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।

তবে প্রধান শিক্ষক একটি গণমাধ্যমকে গতকাল বলেছেন, শোকজের বিষয়ে আমরা অবগত আছি। আমাদের ৪৮৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১০৩ জন টেস্ট পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হওয়ায় তাদের বাদ দিয়ে ৩৮২ জন শিক্ষার্থীকে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। তারা সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছে। এ নিয়ে একটি মহল অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমাদের সব কাজের স্বচ্ছতা রয়েছে। আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বোর্ডকে জবাব দেব।

যা বলছেন স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা

ওই স্কুলের কয়েকজন প্রাক্তন শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলেছে বিবিসি বাংলা। বিভিন্ন কারণে তারা তাদের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।

এদের মাঝে একজন অভিযোগ করেন, এ বছর তার ওই স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু স্কুলের টেস্ট পরীক্ষায় দুই নম্বরের জন্য পদার্থবিজ্ঞানে তিনি উত্তীর্ণ হতে পারেননি। তাই, তিনি ওই স্কুল থেকে বের হয়ে অন্য স্কুল থেকে পরীক্ষা দেন।

অন্য স্কুল থেকে পরীক্ষা দিয়ে তিনি ও তার সহপাঠীদের অনেকেই জিপিএ-৫ পেয়েছেন বলে দাবি তার।

তাহলে স্কুলের পরীক্ষায় কেন তিনি উত্তীর্ণ হতে পারেননি জানতে চাইলে তিনি বলেন, টেস্ট পরীক্ষায় বোর্ড স্ট্যান্ডার্ড প্রশ্ন করা হয় না। এরা ক্লাস ওয়ান থেকে টেন পর্যন্ত পড়ায়। এরপর যখনই মনে হয় যে একে দিয়ে আমরা এ+ পাবো না, তখন অকৃতকার্য দেখায় এবং অভিভাবকদের বলে, আপনার মেয়েকে আরও এক বছর স্কুলে রাখেন, আমরা এ বছর ফরম পূরণ করতে দেবো না। এগুলো বলে শিক্ষার্থীদেরকে আটকে দেয়।

টেস্ট পরীক্ষার খাতা তারা পুনরায় দেখেছিলেন কিনা জানতে চাইলে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিয়ে তিনি বলেন, আমরা দেখলাম যে দুই-তিন মার্ক কম পেয়ে ফেল আসছে আমাদের। তখন আমরা বললাম, এই খাতা তো বোর্ডে দেখলে দুই তিন নাম্বার দিতো।

‘তখন তারা বলছে, আমরা বোর্ডের মতো খাতা দেখি না। দুই-একজন পায়েও ধরছে যে পরীক্ষা দিতে দেন। কিন্তু স্যার বলছে, তোমরা তো এ+ পাবা না, তোমাদেরকে পাশ করিয়ে দিয়ে কী করবো। ওদের নিয়ম হলো, যতজন পরীক্ষা দেওয়াবে, ততজনকেই এ+ পেতে হবে।’

এই শিক্ষার্থী আরও জানান যে গত নভেম্বরে হওয়া স্কুলের টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পর তারা চলতি বছর জানুয়ারিতে জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ করেছিলেন। অভিযোগের পরদিন জেলা প্রশাসন থেকে জানানো হয় যে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের পুনরায় পরীক্ষা গ্রহণ করা হবে। এরপর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বসেই তারা কয়েকটি বিষয়ে পরীক্ষা দেন।

ওই পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ হয়েছিল, তাদেরকে ফরম পূরণ করতে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন জেলা প্রশাসক, এই তথ্য জানিয়ে তিনি আরও দাবি করেন, জেলা প্রশাসক তাদের সামনে বসেই প্রধান শিক্ষককে কল দেন। কিন্তু প্রধান শিক্ষক জানান, তারা ফরম পূরণ করতে দিবে না।

স্কুলটির আরেকজন প্রাক্তন শিক্ষার্থীও দাবি করেন যে স্কুলের টেস্ট পরীক্ষায় উচ্চতর গণিতে তিনি অকৃতকার্য হয়েছিলেন, তাই তিনি সেখান থেকে পরীক্ষা দিতে পারেননি। কিন্তু জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বসে দেওয়া সেই পরীক্ষায় তিনি প্রথম হয়েছিলেন। পরে তিনি নরসিংদী সানবীম স্কুল থেকে বিজ্ঞান বিভাগে পরীক্ষা দেন এবং জিপিএ-৫ পেয়ে কৃতকার্য হন।

এই শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, স্কুলটিতে মাসিক বেতন দুই হাজার ৩০০ টাকা। এর পাশাপাশি অন্যান্য ফি-ও আছে। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ভালো ফলাফল শুধু স্কুলে পড়েই করে না। তাদেরকে স্কুলেরই শিক্ষকদের কাছে বছরব্যাপী প্রাইভেট পড়তে হয়।

এদিকে, শিক্ষার্থীরা যে জেলা প্রশাসকের কথা বলছেন, তার নাম মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের কমিশন সচিব হিসেবে কর্মরত।

তার সাথে কথা হলে তিনি বলেন, স্কুলের কথা হলো ওরা ফেল করছে। তখন আমি দেখতে চাইলাম যে আসলে সত্যি সত্যি ফেল করার মতো কিনা। অনেকেই ফেল করছে। কয়েকজন পাশও করছে। তখন অনুরোধ করেছিলাম যে যারা পাশ করেছে, এদেরকে বিবেচনা করা যায় কিনা। পরে জানতে পেরেছি যে ওরা টিসি নিয়ে অন্য স্কুলে চলে গেছে।

তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে তখন তাদেরকে বলেছিলাম যে কতজন এ+ পেয়েছে, সেটি আমাদের দেখার বিষয় না। একজন শিক্ষার্থীও যেন ফেল না করেন, সেভাবে পাঠদান করেন।'

টেস্ট পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষা বোর্ডের নিয়ম কী?

বাংলাদেশে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, এসএসসি পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীর পড়াশোনার মান যাচাই করে দেখতে স্কুল থেকে টেস্ট বা নির্বাচনী পরীক্ষা নেওয়া হয়।

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অফিশিয়াল নীতিমালা অনুযায়ী, নির্বাচনী (টেস্ট) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত।

বোর্ডের পরীক্ষা পরিচালনাসংক্রান্ত নীতিমালায় বলা আছে, বোর্ড অনুমোদিত কোনো বিদ্যালয় থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষাক্রম শেষ করার পর ওই বোর্ডে রেজিস্ট্রেশন করা শিক্ষার্থী নিজ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবে।

সেখানে স্পষ্ট করে এও লেখা রয়েছে, বোর্ডের কেবলমাত্র বৈধ রেজিস্ট্রেশনধারী এবং নির্বাচনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছাত্র/ছাত্রীরাই পরীক্ষার আবেদন ফরম পূরণ করতে পারবে।

২০১৮ সালে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড থেকে জারি করা একটি বিশেষ আদেশে এসএসসি ও এইচএসসি নির্বাচনী পরীক্ষায় এক বা একাধিক বিষয়ে অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মূল পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অনুমতি না দেওয়া সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়।

স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নির্বাচনী পরীক্ষার উত্তরপত্র বা খাতা পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর অন্তত ছয় মাস পর্যন্ত বিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলকভাবে সংরক্ষণ করারও আদেশ দেওয়া হয় তখন।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী, টেস্ট পরীক্ষায় পাস করতে হবে। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠানের ইন্টেনশন থাকে যে যারা জিপিএ-৫ পাবে না, তাদেরকে ইচ্ছে করে ফেল দেখাবো, যাতে ফরম পূরণ করতে না পারে।

এই বিষয়টিকে তিনি ‘অসুস্থ প্রতিযোগিতা’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, বোর্ড কোনো র‍্যাংকিং করে না, গত তিন বছরে করেনি। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদেরকে সেরা দেখানোর জন্য এটা করে। নিজেকে সেরা দেখালে সেরা শিক্ষার্থীগুলো পাবে। বেতন বেশি নিতে পারবে।

তিনি মনে করেন, যখন কোনো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করে, তখন ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের পাঠদানের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং ওই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বছরের পর বেতন-ভাতা নিয়ে কেন উপরের ক্লাসে তোলা হলো, এটিও তখন দেখার বিষয়।