ছেলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরে আসবে—এই আশায় দিন গড়িয়েছে, মাস পেরিয়েছে, বছরও কেটে গেছে। দেখতে দেখতে কেটে গেছে দীর্ঘ ১৪টি বছর। কিন্তু সেই প্রতীক্ষার শেষ হয়নি। সন্তানের ফেরার অপেক্ষায় আজও পথ চেয়ে আছেন স্নেহময়ী বাবা অধ্যক্ষ মাওলানা ফজলুর রহমান ও মমতাময়ী মা আফিফা রহমান।
তারা কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা মো. ওয়ালিউল্লাহর বাবা-মা।
২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া যাওয়ার পথে সাভারের নবীনগর এলাকা থেকে র্যাব ও ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তুলে নেওয়ার পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন ওয়ালিউল্লাহ। একই সময় তার সাথে থাকা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাংস্কৃতিক সম্পাদক আল-মুকাদ্দাসকেও তুলে নেওয়া হয় বলে পরিবারের অভিযোগ। এরপর থেকে গত ১৪ বছরে তাদের আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে করতে ওয়ালিউল্লাহর বৃদ্ধ বাবা-মা এখন প্রায় ভেঙে পড়েছেন।
বাবা মাওলানা ফজলুর রহমানের ধারণা, ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তুলে নেওয়া তার ছেলে হয়তো আর জীবিত নেই। হয়তো কোনোদিনই আর ফিরে আসবে না সে। তারপরও বাবা-মায়ের মন মানতে চায় না। যদি কোনোদিন ফিরে আসে—এই আশাতেই বুক বেঁধে দিন কাটছে তাদের। ওয়ালিউল্লাহর বাড়ি ঝালকাঠির কাঠালিয়া উপজেলার পশ্চিম শৌলজালিয়া গ্রামে। তিনি কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের মেধাবী ছাত্র ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের অর্থ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করতেন তিনি।
যে রাতে হারিয়ে গেলেন দুই তরুণ
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ওয়ালীউল্লাহ ও আল-মুকাদ্দাস ঢাকায় যান। পরে ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে তারা রাজধানীর কল্যাণপুর থেকে কুষ্টিয়ার উদ্দেশে হানিফ পরিবহনের একটি বাসে (নম্বর-৩৭৫০) ওঠেন। বাসটি রাত সাড়ে ১১টার দিকে কল্যাণপুর থেকে ছেড়ে যায়। রাত প্রায় ১টার দিকে বাসটি সাভারের নবীনগর এলাকায় পৌঁছালে একটি কালো গাড়ি বাসটির গতিরোধ করে। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, র্যাবের পোশাক পরিহিত ৮-১০ জন এবং সাদা পোশাকধারী কয়েকজন ব্যক্তি বাসে ওঠেন। তারা নিজেদের র্যাব ও ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে ওয়ালীউল্লাহ ও আল-মুকাদ্দাসকে বাস থেকে নামিয়ে নিয়ে যান। এরপর থেকেই শুরু হয় দুই পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষা।
দুই তরুণ কোথায় আছেন, কী অবস্থায় আছেন, তাদের সাথে কী ঘটেছে—১৪ বছরেও তার কোনো উত্তর মেলেনি। তারা বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন, সেটিও জানে না পরিবার।
থানায় জিডি, প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও মেলেনি সন্ধান
আল-মুকাদ্দাসের নিখোঁজের ঘটনায় ৬ ফেব্রুয়ারি তার চাচা আবদুল হাই রাজধানীর দারুস সালাম থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। ওয়ালীউল্লাহর নিখোঁজের ঘটনায় ৮ ফেব্রুয়ারি তার বড় ভাই খালেদ সাইফুল্লাহ আশুলিয়া থানায় জিডি করেন। এরপর নিখোঁজ দুই শিক্ষার্থীর পরিবার তাদের সন্ধান পেতে পুলিশ, র্যাবসহ প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করেন। কিন্তু কোনো জায়গা থেকেই তারা সন্তানের সন্ধান পাননি।
পরবর্তীতে নিখোঁজ দুই শিক্ষার্থীর সন্ধান চেয়ে তাদের পরিবার হাইকোর্টে পৃথক দুটি রিট পিটিশন করেন। তবে পরবর্তীতে রিট দুটিও খারিজ হয়ে যায়। সন্তানদের ফিরে পাওয়ার আশায় পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধনও করা হয়। কিন্তু এত বছর পরও ওয়ালিউল্লাহ ও আল-মুকাদ্দাসের সন্ধান মেলেনি।


