...|...|...

ধর্ম

জান্নাতের পথ রুদ্ধকারী ২৩ ভয়াবহ গুনাহ

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৫:৩৯
Shares
জান্নাতের পথ রুদ্ধকারী ২৩ ভয়াবহ গুনাহ

ছবি: সংগৃহীত

জান্নাত প্রতিটি মুমিনের জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য। কিন্তু প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় অনেক সময় আমরা এমন কিছু অপরাধ বা গুনাহে জড়িয়ে পড়ি, যা আমাদের এই মহামূল্যবান প্রাপ্তিকে মারাত্মকভাবে বিপন্ন করে তোলে। কোরআন ও সহিহ হাদিসে এমন কিছু ভয়াবহ অপরাধের কঠোর সতর্কবাণী এসেছে—যেগুলোর পরিণামে জান্নাতে প্রবেশাধিকার বাধাগ্রস্ত হওয়া, জান্নাতের সুবাস থেকে বঞ্চিত থাকা কিংবা জাহান্নামের কঠিন শাস্তির কথা বলা হয়েছে।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এর অনেকগুলো গুনাহই আজ আমাদের সমাজে নানাভাবে শিকড় গেড়েছে। কখনো অভ্যাসবশত, কখনো প্রবৃত্তির তাড়নায়, আবার কখনো বিষয়গুলোকে হালকা মনে করে মানুষ এসব পাপে পা বাড়াচ্ছে।

সহিহ ও গ্রহণযোগ্য হাদিসের আলোকে এমন ২৩টি ভয়াবহ গুনাহ এবং সেগুলোর স্বরূপ নিচে তুলে ধরা হলো, যা আমাদের জীবনকে সংশোধন করতে দিকনির্দেশনা দেবে।

১. ঈমানহীন অবস্থায় থাকা

ঈমান জান্নাতে প্রবেশের মৌলিক শর্ত। আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং তার রাসুল (সা.)-এর প্রতি বিশ্বাস ছাড়া কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ إِلَّا مُؤْمِنٌ

‘মুমিন ছাড়া কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’
—সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৬০৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১১

তিনি আরও বলেছেন,

لَا تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا

‘তোমরা ঈমান না আনা পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।’
—সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫৪

 ২. প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া

ইসলাম প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। অথচ অনেকেই প্রতিবেশীকে কথায়, আচরণে কিংবা কাজে কষ্ট দেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ

‘যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে না, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’
—সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৬

 ৩. অন্তরে অহংকার পোষণ করা

অহংকার মানুষকে সত্য গ্রহণ এবং অন্যকে সম্মান করা থেকে বিরত রাখে। নিজের বড়ত্ব জাহির করা, মানুষকে তুচ্ছ মনে করা এবং সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা অহংকারের প্রকাশ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ

‘যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার রয়েছে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’
—সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯১

 ৪. চোগলখোরি ও মানুষের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি করা

একজনের কথা অন্যজনের কাছে এমনভাবে পৌঁছে দেওয়া, যাতে তাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিবাদ সৃষ্টি হয়, তা অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ نَمَّامٌ

‘চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’
—সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০৫

তিনি আরও বলেছেন,

تَجِدُ مِنْ شَرِّ النَّاسِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عِنْدَ اللَّهِ ذَا الْوَجْهَيْنِ

‘কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষের মধ্যে সেই ব্যক্তিকে পাবে, যে দুমুখো; একদলের কাছে এক রূপে এবং অন্য দলের কাছে আরেক রূপে উপস্থিত হয়।’
—সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫২৬

 ৫. আত্মহত্যা করা

জীবন আল্লাহর দেওয়া আমানত। কোনো বিপদ, হতাশা কিংবা কষ্টের কারণে আত্মহত্যা করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) আত্মহত্যাকারীর ব্যাপারে কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

হাদিসের মর্মার্থ: যে ব্যক্তি পাহাড় থেকে লাফ দিয়ে, বিষপান করে কিংবা কোনো ধারালো অস্ত্রের মাধ্যমে আত্মহত্যা করবে, তার জন্য জাহান্নামে কঠিন শাস্তির হুঁশিয়ারি রয়েছে।
—সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৭৭৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০৯

আত্মহত্যার বিষয়ে এই কঠোর সতর্কবাণী বর্ণনা করার পাশাপাশি মনে রাখতে হবে, মানসিক যন্ত্রণা ও হতাশায় ভোগা মানুষের প্রতি সহমর্মিতা দেখানো জরুরি। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহর সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে রায় দেওয়া উচিত নয়।

 ৬. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা

আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ। রাগ, অভিমান, সম্পদ কিংবা পারিবারিক বিরোধের কারণে আত্মীয়তার সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন করা গুরুতর অপরাধ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَاطِعُ رَحِمٍ

‘আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’
—সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫৬

 ৭. হারাম উপার্জন ও হারাম ভক্ষণ

ঘুষ, প্রতারণা, আত্মসাৎ, সুদ কিংবা অন্য কোনো অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জন করা এবং তা দিয়ে জীবন পরিচালনা করা অত্যন্ত ভয়াবহ বিষয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ لَحْمٌ نَبَتَ مِنْ سُحْتٍ

অর্থ: ‘হারাম উপার্জনে যে দেহের মাংস বৃদ্ধি পেয়েছে, তা জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’
—মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস: ২৭০৩; আলবানি হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।

অতএব, উপার্জনের পরিমাণ বাড়ানোর চেয়ে উপার্জন হালাল কি না, সে বিষয়ে বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

 ৮. উপকার করে খোঁটা দেওয়া

কাউকে সাহায্য করার পর বারবার সেই সাহায্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া, অপমান করা কিংবা তার আত্মসম্মানে আঘাত করা নিন্দনীয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنَّانٌ

‘উপকার করে খোঁটা দেয়, এমন ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’
—সুনান আন-নাসাঈ, হাদিস: ২৫৬২

সাহায্য করার পর প্রতিদানের আশা না করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তা করা উচিত।

 ৯. তাকদির অস্বীকার করা

আল্লাহর জ্ঞান, ইচ্ছা ও তাকদিরের প্রতি ঈমান রাখা ইসলামের মৌলিক আকিদার অন্তর্ভুক্ত।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ عَاقٌّ، وَلَا مُدْمِنُ خَمْرٍ، وَلَا مُكَذِّبٌ بِقَدَرٍ

‘পিতা-মাতার অবাধ্য ব্যক্তি, মদে আসক্ত ব্যক্তি এবং তাকদিরকে অস্বীকারকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’
—আলবানির সিলসিলাতুল আহাদিসিস সহিহাহ, হাদিস: ৬৭৫

 ১০. জাদু ও জাদুর চর্চায় জড়িয়ে পড়া

জাদু শেখা, জাদুর চর্চা করা এবং শিরকপূর্ণ জাদুকে বৈধ বা গ্রহণযোগ্য মনে করা ভয়াবহ গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।

জাদুর মাধ্যমে মানুষের ক্ষতি করা কিংবা আল্লাহর পরিবর্তে অন্য কোনো শক্তির ওপর অলৌকিক ক্ষমতার বিশ্বাস স্থাপন করা থেকে বিরত থাকা জরুরি।

জাদু ও গণকের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কঠোর সতর্কবাণী এসেছে।
—মুসনাদে আহমদ, ৫/৬৫৪

 ১১. মদ ও নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করা

মদ ও অন্যান্য নেশাজাতীয় দ্রব্য মানুষের বিবেক, চরিত্র, পরিবার ও সমাজকে ধ্বংস করে। তাই নেশা সৃষ্টিকারী দ্রব্য থেকে বিরত থাকা মুসলিমের দায়িত্ব।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

كُلُّ مُسْكِرٍ حَرَامٌ

‘প্রত্যেক নেশাদ্রব্য হারাম।’
—সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২০০৩

মদ্যপানে অভ্যস্ত হওয়া এবং নেশার কারণে অন্যের অধিকার নষ্ট করা আরও গুরুতর অপরাধ।

 ১২. গণকের কাছে যাওয়া ও গণনার মাধ্যমে অদৃশ্যের খবর জানার দাবি করা

গণক, জ্যোতিষী কিংবা অদৃশ্যের খবর জানার দাবি করে এমন ব্যক্তির কাছে ভবিষ্যৎ জানার উদ্দেশ্যে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণীতে মদ্যপায়ী, জাদুতে বিশ্বাসী, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী, উপকার করে খোঁটা দানকারী ও গণকের ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী এসেছে।
—মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১১৭৮১

১৩. ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে অবহেলা করা

ঋণ মানুষের ওপর একটি গুরুতর দায়। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধে টালবাহানা করা, পাওনাদারের অধিকার নষ্ট করা কিংবা ঋণ পরিশোধের ইচ্ছা না রাখা অন্যায়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

مَطْلُ الْغَنِيِّ ظُلْمٌ

‘সামর্থ্যবান ব্যক্তির ঋণ পরিশোধে টালবাহানা করা জুলুম।’
—সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪০০; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৬৪

তিনি আরও বলেছেন,

يُغْفَرُ لِلشَّهِيدِ كُلُّ ذَنْبٍ إِلَّا الدَّيْنَ

‘শহীদের সব গুনাহ ক্ষমা করা হবে, ঋণ ছাড়া।’
—সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৮৮৬

তবে কেউ প্রকৃত অসচ্ছলতার কারণে ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে তার অবস্থা ভিন্ন। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ আটকে রাখা আর অসচ্ছলতার কারণে অপারগ হওয়া এক বিষয় নয়।

 ১৪. বিপরীত লিঙ্গের অনুকরণে নিষিদ্ধ বেশভূষা গ্রহণ করা

পুরুষের নারীদের সাদৃশ্যপূর্ণ এবং নারীর পুরুষদের সাদৃশ্যপূর্ণ বিশেষ বেশভূষা গ্রহণের ব্যাপারে হাদিসে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) নারীদের সাদৃশ্য গ্রহণকারী পুরুষ এবং পুরুষদের সাদৃশ্য গ্রহণকারী নারীদের অভিশাপ দিয়েছেন।
—সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৮৮৫

এ বিষয়ে পোশাকের ধরন, সামাজিক রীতি, উদ্দেশ্য ও হাদিসের ব্যাখ্যা বিবেচনায় নিয়ে শরিয়তের নির্দেশনা অনুসরণ করা প্রয়োজন।

 ১৫. দাইয়ুস হওয়া

ইসলাম পরিবারে শালীনতা, পবিত্রতা ও নৈতিকতা রক্ষার নির্দেশ দিয়েছে। পরিবারের সদস্যদের প্রকাশ্য অশ্লীলতা ও অনৈতিক কাজকে জেনেশুনে প্রশ্রয় দেওয়া গুরুতর অপরাধ।

দাইয়ুস সম্পর্কে একটি বর্ণনায় এসেছে,

الدَّيُّوثُ الَّذِي يُقِرُّ فِي أَهْلِهِ الْخَبَثَ

‘দাইয়ুস হলো সেই ব্যক্তি, যে নিজের পরিবারের মধ্যে অশ্লীলতা ও অনৈতিকতাকে মেনে নেয়।’
—মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৫৩৭২; সুনান আন-নাসাঈ, হাদিস: ২৫৬২

তবে পরিবারের দায়িত্বশীল হওয়া মানে জুলুম, সন্দেহপ্রবণতা কিংবা অন্যায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা নয়; বরং ন্যায়সংগতভাবে সৎকাজের নির্দেশ দেওয়া ও অসৎকাজ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা।

 ১৬. বৃদ্ধ বয়সে ব্যভিচার করা

ব্যভিচার সব বয়সেই গুরুতর গুনাহ। তবে বার্ধক্যে পৌঁছেও প্রবৃত্তির অনুসরণে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া বিশেষভাবে নিন্দনীয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

‘কিয়ামতের দিন আল্লাহ তিন শ্রেণির মানুষের সাথে কথা বলবেন না, তাদের পবিত্র করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’

তাদের একজন হলো—

شَيْخٌ زَانٍ

‘বৃদ্ধ ব্যভিচারী।’—সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০৭

 ১৭. মিথ্যাবাদী শাসক হওয়া

শাসকের দায়িত্ব হলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, জনগণের অধিকার রক্ষা করা এবং সত্য ও সততার সাথে দায়িত্ব পালন করা।

অথচ ক্ষমতা ও স্বার্থ রক্ষার জন্য মিথ্যা বলা, জনগণকে প্রতারণা করা এবং দায়িত্বের অপব্যবহার করা গুরুতর অপরাধ।

উপরের হাদিসেই রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

وَمَلِكٌ كَذَّابٌ

‘মিথ্যাবাদী শাসক।’—সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০৭

 ১৮. অহংকারী দরিদ্র হওয়া

অর্থসম্পদ, ক্ষমতা কিংবা সামাজিক মর্যাদা—কোনো কিছুই অহংকারের বৈধ অজুহাত হতে পারে না।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বর্ণিত তিন শ্রেণির মানুষের মধ্যে রয়েছেন—

وَعَائِلٌ مُسْتَكْبِرٌ

‘অহংকারী দরিদ্র।’—সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০৭

অভাবের মধ্যেও কেউ যদি অহংকার, আত্মম্ভরিতা ও অন্যকে তুচ্ছ করার মনোভাব পোষণ করে, তবে তা নিন্দনীয়।

 ১৯. কঠোর স্বভাবের হওয়া এবং যা নেই তা নিয়ে গর্ব করা

মানুষের সাথে দুর্ব্যবহার করা, অহেতুক কঠোরতা দেখানো এবং নিজের কাছে নেই এমন সম্পদ, যোগ্যতা কিংবা মর্যাদা নিয়ে গর্ব করা নিন্দনীয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ الْجَوَّاظُ وَلَا الْجَعْظَرِيُّ

‘কঠোর স্বভাবের ও উদ্ধত ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’
—সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮০১; আলবানি হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।

 ২০. চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা

ইসলাম নিরপরাধ মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। মুসলিমদের সাথে চুক্তিবদ্ধ নিরাপত্তার অধীনে বসবাসকারী অমুসলিমকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা ভয়াবহ অপরাধ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

مَنْ قَتَلَ مُعَاهَدًا لَمْ يَرِحْ رَائِحَةَ الْجَنَّةِ

‘যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমকে হত্যা করবে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।’
—সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩১৬৬

 ২১. জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা

ক্ষমতা ও দায়িত্ব আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আমানত। শাসক কিংবা দায়িত্বশীল ব্যক্তি যদি জনগণের কল্যাণের পরিবর্তে নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দেন এবং তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেন, তবে তার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

مَا مِنْ عَبْدٍ يَسْتَرْعِيهِ اللَّهُ رَعِيَّةً، يَمُوتُ يَوْمَ يَمُوتُ وَهُوَ غَاشٌّ لِرَعِيَّتِهِ إِلَّا حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ

অর্থ: ‘আল্লাহ যে ব্যক্তিকে জনগণের দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, সে যদি তাদের সাথে প্রতারণা করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তবে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেবেন।’
—সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪২

 ২২. মানুষকে অন্যায়ভাবে প্রহার করা ও নির্যাতন করা

ক্ষমতার অপব্যবহার করে মানুষকে প্রহার করা, নির্যাতন করা এবং অন্যায়ভাবে তাদের অধিকার হরণ করা গুরুতর অপরাধ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন এক শ্রেণির মানুষের কথা বলেছেন, যাদের হাতে গরুর লেজের মতো চাবুক থাকবে এবং তারা তা দিয়ে মানুষকে প্রহার করবে।
—সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১২৮

এই হাদিস জুলুম ও নির্যাতনের ভয়াবহ পরিণতির প্রতি সতর্ক করে।

 ২৩. শালীনতা ও পর্দার বিধান লঙ্ঘন করা

ইসলামে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই শালীনতা, দৃষ্টি সংযত রাখা এবং পবিত্রতা রক্ষার নির্দেশ রয়েছে। নারীদের এমন পোশাক ও আচরণ গ্রহণ করা থেকে সতর্ক করা হয়েছে, যা বাহ্যিকভাবে আবৃত হলেও প্রকৃতপক্ষে নগ্নতার প্রকাশ ঘটায় কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে অশালীন প্রদর্শনের মাধ্যমে আকর্ষণ সৃষ্টি করে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

صِنْفَانِ مِنْ أَهْلِ النَّارِ لَمْ أَرَهُمَا... وَنِسَاءٌ كَاسِيَاتٌ عَارِيَاتٌ... لَا يَدْخُلْنَ الْجَنَّةَ وَلَا يَجِدْنَ رِيحَهَا

‘জাহান্নামি দুই শ্রেণির মানুষ রয়েছে, যাদের আমি এখনো দেখিনি... তাদের মধ্যে এমন নারীরাও রয়েছে, যারা পোশাক পরিহিত হয়েও নগ্ন... তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।’
—সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১২৮

এই সতর্কবাণী নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই শালীনতা ও পবিত্রতার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। কাউকে অপমান করা বা ব্যক্তিগতভাবে বিচার করার পরিবর্তে নিজেকে সংশোধন করা এবং শরিয়তের নির্দেশনা মেনে চলাই মুমিনের কর্তব্য।

 গুরুত্বপূর্ণ আকিদাগত সতর্কতা

উপরের বিষয়গুলোর অনেকগুলোই কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। তবে কোনো গুনাহের ব্যাপারে ‘জান্নাতে প্রবেশ করবে না’ বলা হলে তার অর্থ সব ক্ষেত্রেই এই নয় যে, ওই গুনাহে লিপ্ত প্রত্যেক ব্যক্তি চিরস্থায়ীভাবে জান্নাত থেকে বঞ্চিত হবে।

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি শিরক ছাড়া অন্য কবিরা গুনাহে লিপ্ত হয়ে তওবা না করে মৃত্যুবরণ করলেও তার চূড়ান্ত পরিণতি আল্লাহর ইচ্ছাধীন। আল্লাহ চাইলে তাকে ক্ষমা করতে পারেন, আবার চাইলে তার অপরাধের শাস্তি দিতে পারেন।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ

অর্থ: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সাথে শিরক করাকে ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্য পাপ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।’
—সূরা আন-নিসা: ৪৮

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ

‘যে ব্যক্তি এ কথা জেনে মৃত্যুবরণ করবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’
—সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬

সুতরাং কোনো মুসলিম কবিরা গুনাহে লিপ্ত হলে সে ভয়াবহ বিপদের মধ্যে রয়েছে; কিন্তু তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাফির কিংবা চিরস্থায়ী জাহান্নামি ঘোষণা করা সঠিক নয়। আল্লাহ যাকে ক্ষমা করবেন না, তাকে তার গুনাহের শাস্তি দিতে পারেন। এরপর তাওহীদপন্থী মুমিনদের পরিণতি সম্পর্কে আহলুস সুন্নাহর আকিদা হলো, তারা চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে থাকবে না।

তবে এই আশায় গুনাহকে কখনোই হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। বরং দ্রুত তওবা করা, মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং নিজের জীবন সংশোধন করাই মুমিনের কর্তব্য।

আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রকাশ্য ও গোপন সকল গুনাহ থেকে হেফাজত করুন, কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন এবং তাঁর অসীম রহমতে আমাদের সবাইকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন। আমিন।