নেপালের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রথম ভাষণে বিশ্বনেতাদের সামনে হিমালয়ের ভঙ্গুর পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের সংকট তুলে ধরেছেন বালেন্দ্র শাহ। তবে তার এ বক্তব্যের পাশাপাশি সবার নজর কেড়েছে তার মুখের বিশেষ কালো চশমাটি, যা তার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি স্থায়ী প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার সময় ৩৬ বছর বয়সী এই তরুণ নেতা তার চিরচেনা ফুল-ফ্রেমের আয়তাকার ডার্ক সানগ্লাস বা কালো চশমা পরেই বক্তব্য দেন। চশমার পাশাপাশি তার পরনে ছিল তার সেই বিখ্যাত ‘ইউনিফর্ম’—ঐতিহ্যবাহী কালো নেপালি টুপি এবং কালো রঙের ব্লেজার।
কালো চশমা খোলেন না কেন বালেন্দ্র শাহ?
নেপালি সংবাদমাধ্যম ‘দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট’-এর তথ্য অনুযায়ী, বালেন্দ্র শাহ কখন এবং কীভাবে তার এই চশমা পরবেন, সে বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন। তিনি পার্লামেন্ট অধিবেশন, সরকারি অনুষ্ঠান, সামরিক কুচকাওয়াজ এবং বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে ছবি তোলার সময়ও এই চশমা পরে থাকেন। তবে মন্ত্রিসভার বৈঠক, একান্ত আলোচনা বা যৌথ বৈঠকের সময় তিনি এই চশমা খুলে রাখেন।
এনডিটিভির তথ্যমতে, র্যাপার থেকে রাজনীতিতে আসা বালেন্দ্র শাহের এই সিগনেচার ডার্ক সানগ্লাস তার মিউজিক কেরিয়ার থেকে শুরু করে দেশটির সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদে আসীন হওয়া পর্যন্ত সবসময় তার সাথে রয়েছে। তার এই চশমা তার ব্যক্তিত্বে এক রহস্যময় ভাব বজায় রাখে, কারণ তিনি সাধারণত মূলধারার সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার বা সংবাদ সম্মেলন এড়িয়ে চলেন এবং সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমেই নিজের বক্তব্য প্রকাশ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
তার এই চশমা নেপালের জনপ্রিয় অনলাইন শপিং প্ল্যাটফর্ম ‘দারাজ’-এর একটি বড় আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। দারাজে গিয়ে ‘বালেন্দ্র শাহ গ্লাস’ লিখে সার্চ করলেই তার চশমার আদলে তৈরি বিভিন্ন সানগ্লাসের সন্ধান মেলে।
রাজনৈতিক উত্থান ও সানগ্লাস
২০২২ সালে যখন তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচনে জয়লাভ করেছিলেন, তখন তিনি দেশের প্রবীণ রাজনৈতিক দলগুলোকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। তার পরনে থাকা সিগনেচার কালো স্যুট এবং ডার্ক সানগ্লাস তাকে প্রচলিত দলীয় রাজনীতির বাইরে একজন তরুণ ও ভিন্নধারার নেতা হিসেবে পরিচিত করে তোলে।
এর পর গত বছরের (২০২৫) সেপ্টেম্বর মাসে তরুণদের নেতৃত্বাধীন এক গণঅভ্যুত্থানের মুখে কে পি শর্মা অলির সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। চলতি বছরের শুরুর দিকে নির্বাচনী প্রচারণায়ও তিনি তার এই ট্রেডমার্ক রূপ বজায় রেখেছিলেন। পরবর্তীতে গত মার্চ মাসের সংসদ নির্বাচনে তার নতুন দল ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’ ঐতিহাসিক ভূমিধস জয় লাভ করে। সেই নির্বাচনে তিনি নিজে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলিকে তার নিজ পূর্বের জেলায় পরাজিত করে দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও তিনি নিয়মিত এই চশমা পরেই আসছেন।
যে তিনবার চশমা খুলেছিলেন বালেন্দ্র শাহ
তবে তার রাজনৈতিক জীবনের এমন কিছু বিরল মুহূর্তও রয়েছে, যখন তিনি চশমা খুলে জনগণের মুখোমুখি হয়েছেন। এর মধ্যে গত জুলাই মাসে দক্ষিণ নেপালে মারাত্মক হিন্দু-মুসলিম সংঘাতের পর জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার সময় তিনি চশমা খুলেছিলেন। এরপর গত আগস্ট মাসে ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শনের সময়ও তাকে চশমা ছাড়া দেখা যায়। এছাড়া তৃতীয় আরেকটি ঘটনায়, কিছুদিন আগে তিনি নিজের সমর্থকদের উদ্দেশে ‘আমি তোমাদের ভালোবাসি’ বলার সময় চশমা খুলেছিলেন।
উল্লেখ্য, গত আগস্ট মাসে পার্লামেন্টে জনসমালোচনার হাত থেকে রক্ষা পেতে স্পিকার দোল প্রসাদ আর্যল পার্লামেন্ট ভবনের ভেতরে কালো চশমা পরে আসার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। তবে পরবর্তীতে ‘দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট’ জানায় যে, অতিরিক্ত আলোর কারণে চোখের সুরক্ষায় চিকিৎসকের পরামর্শেই প্রধানমন্ত্রী এই চশমা পরে থাকেন বলে তার কার্যালয় থেকে সাফাই দেওয়া হয়েছিল।


