...|...|...

আইন ও আদালত

চেকের মামলায় পাওনা শোধ ও সমঝোতা হলে কারাদণ্ড নয় : হাইকোর্ট

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকেল ৪:৪৯
Shares
চেকের মামলায় পাওনা শোধ ও সমঝোতা হলে কারাদণ্ড নয় : হাইকোর্ট

চেক ডিজঅনারের মামলায় চেকে উল্লেখ করা আর্থিক দায় পুরোপুরি পরিশোধ এবং বাদী-বিবাদীর মধ্যে আপস হলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কারাগারে পাঠানো বা কারাদণ্ড বহাল রাখা সমীচীন নয় বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

আদালত বলেছেন, নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১ এর ১৩৮ ধারায় দায়ের করা চেক ডিজঅনার মামলার মূল উদ্দেশ্য কাউকে শাস্তি দেওয়া বা কারাবন্দি রাখা নয়। বরং এসব মামলার প্রধান লক্ষ্য হলো পাওনা অর্থ আদায় নিশ্চিত করা।

বিচারপতি মো. বশির উল্লাহর একক হাইকোর্ট বেঞ্চ নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় দায়ের করা একটি ক্রিমিনাল আপিল নিষ্পত্তি করে এ রায় দেন। মো. আবদুল হান্নান মাস্টার বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য মামলায় গত ৩ সেপ্টেম্বর রায়টি দেওয়া হয়।

এ মামলায় আপিলকারীর পক্ষে রায় ঘোষণার সময় কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না। বিবাদী ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. জিসান মাহমুদ। তার সাথে ছিলেন আইনজীবী তাসনুভা কায়সার। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মিজানুর রহমান এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সিরাজুল করিম (রবি)।

আদালত রায়ে চেকের বকেয়া অর্থ ও সংশ্লিষ্ট পাওনাদি পুরোপুরি পরিশোধ করে পক্ষগুলোর মধ্যে আপস-মীমাংসা হওয়ায় আবদুল হান্নান মাস্টারের এক বছরের কারাদণ্ড বাতিল করেন। একই সাথে আপিল দায়েরের আগে অধস্তন আদালতে জমা দেওয়া ১৪ হাজার ১০০ টাকা ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সকে বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

মামলার প্রেক্ষাপট

মামলার নথি অনুযায়ী, সিরাজগঞ্জের বাসিন্দা মো. আবদুল হান্নান মাস্টার ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্স থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। তিনি পরবর্তী সময়ে ২১ হাজার ৮৭৫ টাকা পরিশোধ করেন। বাকি ২৮ হাজার ১২৫ টাকার বিপরীতে তিনি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের সিরাজগঞ্জ শাখার একটি চেক দেন।

ওই চেকটি নগদায়নের জন্য ২০০৯ সালের ১৯ জানুয়ারি ব্যাংকে উপস্থাপন করা হলে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যাপ্ত তহবিল না থাকায় তা ডিজঅনার হয়। পরে আইন অনুযায়ী লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হলেও পাওনা অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। এরপর ২০০৯ সালে তার বিরুদ্ধে নালিশি সিআর মামলা দায়ের করা হয়।

পরে মামলাটি ২০১২ সালে বিচারের জন্য সিরাজগঞ্জের দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তর করা হয়। আসামি পলাতক থাকায় তার অনুপস্থিতিতেই বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। সিরাজগঞ্জের দায়রা জজ ২০১৩ সালের ১৯ মার্চ দেওয়া রায়ে তাকে নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। একইসাথে তাকে ৮৪ হাজার ৩৭৫ টাকা জরিমানাও করা হয়।

এরপর আবদুল হান্নান মাস্টার ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে ক্রিমিনাল আপিল করেন এবং জামিনের আবেদন জানান। হাইকোর্ট ২০১৮ সালের ৭ আগস্ট তাকে এক বছরের জন্য জামিন দেন।

পরে আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় তিনি চেকের অবশিষ্ট অর্থ ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সকে পরিশোধ করেন। এরপর চলতি বছরের ২১ জুলাই আবদুল হান্নান মাস্টার ও ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সের মধ্যে একটি আপসনামা স্বাক্ষরিত হয়।

হাইকোর্টের নির্দেশনা

আপিল নিষ্পত্তির রায়ে হাইকোর্ট বলেন, মামলার তথ্য-উপাত্ত, পারিপার্শ্বিকতা, অপরাধের মাত্রা এবং আপিলকারী কর্তৃক চেকের সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধের বিষয় বিবেচনায় তার দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় বহাল রাখা হলো। তবে ৮৪ হাজার ৩৭৫ টাকার অর্থদণ্ড কমিয়ে চেকে উল্লেখিত ২৮ হাজার ১২৫ টাকা করা হয়েছে।

আদালত আরও বলেন, আপিলকারী ইতোমধ্যে বিচারিক আদালতে ১৪ হাজার ১০০ টাকা জমা দিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে তিনি অবশিষ্ট অর্থ সরাসরি নালিশকারী ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সের কাছে পরিশোধ করেছেন। তাই সংশ্লিষ্ট আদালতকে জমা দেওয়া ১৪ হাজার ১০০ টাকা যথাযথ শনাক্তকরণ সাপেক্ষে অবিলম্বে ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সকে বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এ ছাড়া মামলার নথিপত্রসহ হাইকোর্টের রায়ের অনুলিপি অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট আদালতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সের আইনজীবী মো. জিসান মাহমুদ বলেন, আদালত এ রায়ের মাধ্যমে আইনি সুবিচারের পাশাপাশি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিরও অনন্য প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল পাওনা অর্থ আদায় করা, কাউকে অহেতুক শাস্তি দেওয়া নয়।

তিনি বলেন, যেহেতু আপিলকারী চেকের পুরো অর্থ পরিশোধ করেছেন এবং উভয় পক্ষের মধ্যে আপসনামা হয়েছে, তাই ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্স তার কারাদণ্ড মওকুফের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছিল। আদালত চেকের সমপরিমাণ অর্থদণ্ড বহাল রেখে আপিলকারীর কারাদণ্ড বাতিল করায় তাদের কোনো আপত্তি ছিল না। বরং তারা আদালতের ন্যায়বিচারকেন্দ্রিক এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন।