দেশের অধিকাংশ চিনিকল যখন বছরের পর বছর লোকসানের বোঝা টানছে, তখন ব্যতিক্রমী সাফল্য দেখিয়েছে চুয়াডাঙ্গার কেরু এন্ড কোম্পানি। তবে সমন্বিত সব সেক্টর মিলে এটাকে দর্শনার কেরুজ কমপ্লেক্স বলা হয়।
সরকারি রাজস্ব খাতে বিপুল অর্থ জমা দেওয়ার পাশাপাশি চিনি কারখানার লোকসান পুষিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি অর্জন করেছে ১৬৫ কোটি ২৪ লাখ ৩১ হাজার টাকা মুনাফা, যা কেরুজ কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠার পর সর্বকালের সর্বোচ্চ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একইসাথে আগের অর্থবছরের তুলনায় চিনি কারখানার লোকসানও কিছুটা কমেছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে কেরুজ কমপ্লেক্স সরকারের রাজস্ব খাতে প্রায় ১৫৩ কোটি টাকা ভ্যাট ও আয়কর জমা দিয়েছে। এর পাশাপাশি চিনি কারখানার ৬০ কোটি ১৯ লাখ ৭৩ হাজার টাকা লোকসান পুষিয়ে প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১৬৫ কোটি ২৪ লাখ ৩১ হাজার টাকা।
কেরুজ কমপ্লেক্সের ছয়টি বিভাগের মধ্যে পাঁচটিই এবার মুনাফা অর্জন করেছে। সবচেয়ে বেশি মুনাফা এসেছে ডিস্টিলারি বিভাগ থেকে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ বিভাগে ফরেন লিকার উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার ৮৬২ কেস এবং বিক্রি হয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার কেস। একই সময়ে বোতলজাত বাংলা মদ উৎপাদন হয়েছে ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৮১০ কেস এবং বিক্রি হয়েছে ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৫৮ কেস। সব মিলিয়ে ডিস্টিলারি বিভাগ থেকে মুনাফা অর্জন হয়েছে ২২৩ কোটি ৭৯ লাখ ৩২ হাজার টাকা।
এছাড়া নয়টি খামারে ৫ লাখ ৪৭ হাজার টাকা, আকন্দবাড়িয়া পরীক্ষামূলক খামারে ৭ লাখ ৬২ হাজার টাকা, আকন্দবাড়িয়া বায়োফার্টিলাইজার বা জৈব সার কারখানায় এক কোটি ৪৭ লাখ ৮৪ হাজার টাকা এবং ডিস্টিলারি ফার্মাসিউটিক্যাল বিভাগে ৩ লাখ ৭৯ হাজার টাকা মুনাফা অর্জিত হয়েছে।
এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কেরুজ কমপ্লেক্সের মোট মুনাফা হয়েছিল ১২৯ কোটি ৪৪ লাখ ৭৮ হাজার ৬১৫ টাকা। সে বছর চিনি কারখানায় লোকসান হয়েছিল ৬২ কোটি ১৮ লাখ ২২ হাজার ৪৫১ টাকা। একই অর্থবছরে ডিস্টিলারি বিভাগে মুনাফা ছিল ১৯০ কোটি ৮ লাখ ২৯ হাজার ৬৮৪ টাকা। নয়টি বাণিজ্যিক খামারে ৩৮ লাখ ৯ হাজার ৭১২ টাকা, আকন্দবাড়িয়া পরীক্ষামূলক খামারে ৩২ লাখ ৮৮ হাজার ৬২৫ টাকা, বায়োফার্টিলাইজারে ৭৮ লাখ ৫২ হাজার ৫৬৯ টাকা এবং ডিস্টিলারি ফার্মাসিউটিক্যালে ৫ লাখ ২০ হাজার ৪৭৬ টাকা মুনাফা হয়েছিল।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কেরুজ কমপ্লেক্সের মুনাফা বেড়েছে প্রায় ৩৫ কোটি ৭৯ লাখ ৫৩ হাজার ৪৪০ টাকা। প্রবীণ শ্রমিক-কর্মচারীদের মতে, এটি কেরুজ কমপ্লেক্সের ইতিহাসে সর্বোচ্চ মুনাফার রেকর্ড।
কেরুজ কমপ্লেক্সের বয়স এরই মধ্যে ৮৮ বছর পেরিয়েছে। দীর্ঘদিনের পুরোনো যন্ত্রপাতি নিয়ে অনেকটা জোড়াতালি দিয়েই প্রতিবছর আখ মাড়াই কার্যক্রম চালাতে হয়। মাড়াই মৌসুমে বারবার যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভোগান্তিতেও পড়তে হয়। তবে এবছর এর বিপরীতে ডিস্টিলারি বিভাগে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। প্রায় দুই বছর আগে ফরেন লিকার উৎপাদনে অটোমেশন স্থাপন করা হয়েছে। দেশীয় মদ বোতলজাতকরণেও আধুনিক মেশিন স্থাপন করা হলে এ বিভাগ আরও কার্যকর হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
কেরুজ কমপ্লেক্সের বিভিন্ন বিভাগে সম্প্রতি প্রায় দেড়শ কোটি টাকা ব্যয়ে বিএমআরইসহ বেশ কয়েকটি উন্নয়নকাজ হয়েছে। এর মধ্যে ১০২ কোটি টাকা ব্যয়ে চিনিকল আধুনিকায়নের কাজও রয়েছে। আধুনিকায়নের কাজ পুরোপুরি শেষ হলে চিনি কারখানার লোকসান আরও কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
২০২৫-২৬ মাড়াই মৌসুমে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ৫ হাজার ৫৬২ একর জমিতে আখ চাষ করা হয়। এর মধ্যে কৃষকের জমি ছিল ৩ হাজার ৯৩৫ একর এবং কেরুজের নিজস্ব জমি ১ হাজার ৬২৫ একর। লক্ষ্য ছিল ৬৯ মাড়াই দিবসে ৭৬ হাজার মেট্রিক টন আখ মাড়াই এবং ৪ হাজার ২৫৬ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন। দৈনিক গড় মাড়াই হার নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ হাজার ১৫০ মেট্রিক টন এবং চিনি আহরণের হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে পুরোনো চিনিকলেই মাড়াই কার্যক্রম শুরু হওয়ায় নির্ধারিত ৬৯ দিনের পরিবর্তে মাত্র ৫৯ দিন মাড়াই চলে।
এসময় আখ মাড়াই হয়েছে ৬৫ হাজার ২০০ মেট্রিক টন, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১১ হাজার মেট্রিক টন কম। চিনি উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন, লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় যা প্রায় ৮৫০ মেট্রিক টন কম। তবে চিনি আহরণের হার লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় খুব বেশি পিছিয়ে ছিল না।
মৌসুমে এ হার ৫ দশমিক ৪১ শতাংশ থেকে ৫ দশমিক ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ওঠানামা করেছে। দৈনিক গড় আখ মাড়াই হয়েছে ১ হাজার ৪২ মেট্রিক টন, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ১৫০ মেট্রিক টন। চিনি কারখানার লোকসান কমিয়ে কেরুজকে আরও লাভজনক করতে আখ চাষ বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ। কৃষকদের সাথে নিয়মিত সভা-সমাবেশ ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন কেরুজ কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাব্বিক হাসান। কৃষকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনের সময় সহযোগিতার আশ্বাসও দেওয়া হচ্ছে।
কেরুজ কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাব্বিক হাসান বলেন, এ অঞ্চলের অন্যতম অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি কেরুজ কমপ্লেক্স। প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি বিভাগেই সবার অবদান রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের এই মূল্যবান সম্পদকে টিকিয়ে রাখতে অন্যতম কাঁচামাল আখের উৎপাদন বাড়ানো জরুরি।


