...|...|...

সারাদেশ

ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত মাদারীপুরের জনজীবন

মাদারীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬, দুপুর ১২:২১ | আপডেট: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ৯:৫৯
Shares
ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত মাদারীপুরের জনজীবন

ফাইল ছবি

তীব্র দাবদাহের মধ্যে অনিয়মিত ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন মাদারীপুরের মানুষ। শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম— সর্বত্রই দেখা দিয়েছে বিদ্যুতের তীব্র সংকট। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসায়ীরা। নির্দিষ্ট কোনো সময়সূচি না থাকায় কখন বিদ্যুৎ আসবে, আর কখন চলে যাবে তা নিয়েও তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দিন-রাত মিলিয়ে কয়েক দফায় বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। এতে একদিকে যেমন প্রচণ্ড গরমে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎনির্ভর শিক্ষা, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানেও পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব।

ঝাউদি ইউনিয়নের মাদ্রা গ্রামের অনার্সের শিক্ষার্থী রাবেয়া আক্তার ও রহিমা আক্তার জানান, তাদের এলাকায় দিন-রাত মিলিয়ে মাত্র এক থেকে দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। এত অল্প সময়ে পড়াশোনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে রাতে পড়তে বসার সময় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় আসন্ন পরীক্ষার প্রস্তুতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

একই অভিযোগ রাজারচর এলাকার আয়েশা, শীলা ও সাইফুলের। তারা বলেন, পড়তে বসলেই বিদ্যুৎ চলে যায়। এতে পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। সামনে পরীক্ষা থাকলেও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ঠিকমতো প্রস্তুতি নিতে পারছেন না তারা।

কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন একাডেমির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. ইউনুস আলী জানান, প্রচণ্ড গরমের মধ্যে শ্রেণিকক্ষে বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীদের কষ্ট হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে তাদের নিয়মিত উপস্থিতিতেও।

বিদ্যুৎ সংকটে স্থবির হয়ে পড়েছে জেলার ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পও। ওয়েল্ডিং মিস্ত্রি হায়দার সরদার বলেন, কাজ শুরু করার পরপরই অনেক সময় বিদ্যুৎ চলে যায়। ফলে কাজের গতি কমে যাচ্ছে এবং নির্ধারিত সময়ে অর্ডার সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

ছাপাখানার মালিক অলিউল আহসান কাজল জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় মুদ্রণকাজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে সময়মতো কাজ শেষ করা যাচ্ছে না, পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।

বুটিকস উদ্যোক্তা শিউলি আক্তার জানান, তার প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২০ জন নারী কাজ করেন। বিদ্যুৎ না থাকলে কাজ বন্ধ রেখে কর্মীদের বসিয়ে রাখতে হয়। এতে একদিকে শ্রমঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে উৎপাদন কমে গিয়ে ব্যবসায়িক ক্ষতি বাড়ছে।
এদিকে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটনির্ভর ফ্রিল্যান্সিং কাজেও দেখা দিয়েছে সংকট। 

ফ্রিল্যান্সার শাহরিয়ার ও শুভ জানান, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে কম্পিউটার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং ইন্টারনেট সংযোগও বিঘ্নিত হচ্ছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে ক্লায়েন্টদের কাজ জমা দেওয়া যাচ্ছে না। এতে সরাসরি আয়ে প্রভাব পড়ছে এবং আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্ট হারানোর আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।

বিদ্যুৎ সংকটে বিপাকে পড়েছেন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালকেরাও। পর্যাপ্ত সময় চার্জ দিতে না পারায় অনেক চালক নিয়মিত রাস্তায় অটোরিকশা নামাতে পারছেন না। ফলে কমে যাচ্ছে তাদের দৈনিক আয়।

শুধু শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নয়, অতিরিক্ত গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকায় স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। মাদারীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) অখিল সরকার বলেন, অসহনীয় গরম ও বিদ্যুৎহীনতার কারণে শিশুদের বিভিন্ন ধরনের ত্বকের সমস্যা বাড়ছে। পাশাপাশি প্রবীণদের উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগসহ নানা শারীরিক জটিলতা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, তীব্র গরমের এ সময়ে অন্তত নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। হঠাৎ হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়া এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবনে যে দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।