...|...|...

ক্যাম্পাস

কুঞ্জবন ঘোষণার এক বছরেও বদলায়নি বলধা গার্ডেনের চিত্র

জবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ভোর রাত ৫:৩৫
Shares
কুঞ্জবন ঘোষণার এক বছরেও বদলায়নি বলধা গার্ডেনের চিত্র

বলধা গার্ডেন। ছবি: টাইমস টুডে

কুঞ্জবন ঘোষণার এক বছর পেরিয়ে গেলেও বদলায়নি পুরান ঢাকার বলধা গার্ডেনের চিত্র। একই সাথে যেন সংরক্ষণ ও নগরদূষণের দুই বাস্তবতা ফুটে উঠেছে বলধা গার্ডেনের বাস্তব চিত্রে। একদিকে শতবর্ষী ও দুর্লভ গাছপালা, জলাশয়, পাখি ও বাদুড়ের বিচরণ, অন্যদিকে সড়কের ধুলা, যানবাহনের শব্দ, পর্যাপ্ত সূর্যালোকের ঘাটতি এবং কিছু গাছের পরিচর্যার সীমাবদ্ধতা। সরেজমিনে বাগান ঘুরে দেখা যায়, আইনি সুরক্ষার স্বীকৃতি মিললেও এর পরিবেশগত চাপ পুরোপুরি কমেনি।

ওয়ারীর ঐতিহাসিক এই বাগানকে গত বছরের ১০ আগস্ট ‘কুঞ্জবন’ ঘোষণা করে বন অধিদফতর। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২-এর ২৩(১) ধারায় এ ঘোষণা দেওয়া হয়। বৃক্ষ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, বাগানের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মূল্য রক্ষা এবং শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ তৈরি করাকে ঘোষণার অন্যতম উদ্দেশ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

কুঞ্জবন ঘোষণার এক বছর পরও কংক্রিটে ঘেরা পুরান ঢাকার মধ্যে ৩ দশমিক ৩৮ একরের বলধা গার্ডেন যেন এক আলাদা সবুজ পরিসর। প্রবেশের সাথে সাথেই শোনা যায় পাখির ডাক, কোথাও দেখা যায় বাদুড়ের বিচরণ; মাথার ওপর শতবর্ষী গাছের ছায়া, পাশে জলাশয়। তার সাথে সড়কসংলগ্ন অংশে গাছের পাতা ও ডালে জমে থাকা ধুলা এবং চারপাশের যানবাহনের শব্দ বলে দেয়, নগরের পরিবেশগত চাপ থেকে এই ঐতিহাসিক উদ্যানটিও পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নয়।

১৫ হাজার উদ্ভিদের সংগ্রহ

বলধা এস্টেটের তৎকালীন জমিদার ও প্রকৃতিপ্রেমী নরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী ১৯০৯ সালে ওয়ারীতে বলধা গার্ডেন প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে এটি জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের একটি স্যাটেলাইট ইউনিট। সাইকি ও সিবিলী দুটি অংশে বিভক্ত বাগানটিতে দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে।

অধিদফতরের সর্বশেষ নথি অনুযায়ী, বর্তমানে এখানে প্রায় ৬৭২ প্রজাতির ১৫ হাজার উদ্ভিদ রয়েছে। তবে গার্ডেনের ইতিহাসসংবলিত সাইনবোর্ডে প্রায় ১৮ হাজার উদ্ভিদ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। বনসাইকি ও সিবিলী মিলিয়ে উদ্ভিদ প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ৮০০ বলেও সাইনবোর্ডে উল্লেখ রয়েছে।

সিবিলী অংশের উল্লেখযোগ্য আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে শঙ্খচূড়, ক্যামেলিয়া, স্বর্ণ অশোক, আফ্রিকান টিউলিপ, সূর্যঘড়ি, জয় হাউস ও ফার্ন হাউস। জয় হাউসের ক্যামেলিয়া ফুলের সৌন্দর্য দেখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবিতা লিখেছিলেন বলেও সাইনবোর্ডে উল্লেখ রয়েছে।

বাগানের আঁকাবাঁকা পথে রাজ অশোক, বন সোনালু, জামরুল, বিচিত্র বকুল, বিচিত্র রাবার, ইউক্যালিপটাস, হিজল, নাগলিঙ্গম, মুসান্ডাসহ নানা প্রজাতির গাছ দেখা যায়। জলাশয়ে মাছ এবং গাছের ডালে বাদুড় রয়েছে। তবে সরেজমিনে অতিথি পাখির উপস্থিতি দেখা যায়নি।

গাছের পরিচয় জানানোর জন্য বিভিন্ন জায়গায় নামফলক রয়েছে। কয়েকটি পুরোনো ও ক্ষতিগ্রস্ত। কোথাও আবার নামফলক নেই। বিশেষ করে সড়কের কাছাকাছি বড় গাছগুলোর পাতা ও ডালে ধুলার আস্তরণ চোখে পড়ে।
বলধা গার্ডেনের কিউরেটর ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোছা. তাসলিমা খাতুন বলেন, ‘দূষণের কারণে গাছপালার কী ধরনের বা কতটা নির্দিষ্ট ক্ষতি হচ্ছে, তা জানতে গবেষণা প্রয়োজন। তবে দূষণের প্রভাব যে গাছপালার ওপর পড়ছে, তা সাধারণভাবেই বোঝা যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিশেষ করে শীতকালে ধুলাবালি বেড়ে গেলে গাছের পাতায় আস্তরণ পড়ে। এতে সালোকসংশ্লেষণ ও সূর্যালোক গ্রহণ বাধাগ্রস্ত হয়। দুর্লভ প্রজাতির গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও দীর্ঘায়ুর জন্য প্রয়োজনীয় আলোও বাগানের সব জায়গায় সমানভাবে পাওয়া যায় না। আশপাশের ভবন ও নগরের পরিবেশ এর সাথে যুক্ত।’

জীববৈচিত্র্যেও নজর দিতে হবে

বিশেষজ্ঞদের মতে, বলধা গার্ডেনের সংরক্ষণ শুধু গাছপালা টিকিয়ে রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। জলাশয়ের পানির গুণগত মান, মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর উপস্থিতি এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রভাবও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। দুর্লভ ও পুরোনো গাছগুলোর আলাদা তালিকা করে তাদের বয়স, স্বাস্থ্য ও পরিচর্যার প্রয়োজনীয়তা নথিভুক্ত করা হলে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ পরিকল্পনা করা সহজ হবে। একই সাথে বাগানের জীববৈচিত্র্যের ওপর নিয়মিত তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজন রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, ‘ঢাকায় খোলা জায়গা ও পার্কের ঘাটতি রয়েছে। গাছপালা ও খোলা জায়গা বাতাস চলাচল, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং বায়ুদূষণ কমাতে ভূমিকা রাখে। শিশুদের খেলাধুলা ও মানসিক বিকাশের পাশাপাশি দুর্যোগের সময়ও এসব জায়গা গুরুত্বপূর্ণ।’

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সহ-সভাপতি পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহাম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, ‘অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দুর্বল ব্যবস্থাপনায় পুরান ঢাকার অনেক উন্মুক্ত স্থান হারিয়েছে। দখল, স্থায়ী-অস্থায়ী স্থাপনা এবং অতিরিক্ত কংক্রিট ব্যবহারে অনেক জায়গার প্রাকৃতিক চরিত্র বদলে গেছে।’

প্রতিষ্ঠার ৫৩ বছর পর, ১৯৬২ সালে বলধা গার্ডেনের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বন বিভাগের কাছে দেওয়া হয়। জমিদার পরিবারের সমাধি, জয় হাউসসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা এখনো এর অতীতের সাক্ষ্য বহন করছে। কুঞ্জবন ঘোষণার এক বছর পর বলধা গার্ডেনের চিত্র একদিকে সংরক্ষিত ঐতিহ্যের, অন্যদিকে নগরের পরিবেশগত চাপের।

শতবর্ষী ও দুর্লভ উদ্ভিদের এই সংগ্রহ টিকিয়ে রাখতে আইনি সুরক্ষার পাশাপাশি প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক পরিচর্যা, দূষণের প্রভাব পর্যবেক্ষণ, পর্যাপ্ত আলো নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা।