কানাডায় ভুয়া কাগজপত্র ও মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে একটি সুসংগঠিত অভিবাসন জালিয়াতি চক্র পরিচালনার অভিযোগে চার বাংলাদেশিকে আদালতে হাজির করা হয়েছে এবং অপর এক পলাতক আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সির দীর্ঘ তদন্তের পর এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) কানাডা সরকারের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযুক্ত চার ব্যক্তি—রাসেল মির্জা, মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম, মো. মুদাচ্ছের আলম ভূঁইয়া এবং কাজী নাফিজ আলম ভ্যালফিল্ড আদালতে হাজিরা দিয়েছেন। অন্যদিকে, মামলার পঞ্চম অভিযুক্ত মো. রাকিবুল হাসান বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে এবং তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
অভিযানের সূত্রপাত ও জালিয়াতির ধরন
২০২৪ সালের ৩ জুলাই সিবিএসএ, মার্সি শহরের পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস বিভাগের প্রতিনিধিদের নিয়ে মার্সি এলাকার একটি বেসরকারি বাসভবনে কমপ্লায়েন্স ও নিয়ন্ত্রণমূলক চেক পরিচালনা করে। সেখানে ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড রিফিউজি প্রটেকশন অ্যাক্ট’-এর বেশ কিছু নিয়ম লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়ার পর ওই বছরের আগস্ট মাসে অভিযুক্তদের কার্যক্রম নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করে সিবিএসএ।
তদন্তে দেখা যায়, কানাডীয় নাগরিকদের হোস্ট বা আমন্ত্রণকারী দেখিয়ে মোট ২০৯ জন বাংলাদেশি নাগরিকের জন্য ২৪৩টি টেম্পোরারি রেসিডেন্ট ভিসা বা সাময়িক আবাসিক ভিসার আবেদন জমা দেওয়া হয়েছিল। তদন্তকারীরা দেখতে পান যে, ভুয়া নথিপত্র এবং মিথ্যা বিবৃতির মাধ্যমে এই বিদেশি নাগরিকদের টিআরভি ভিসা পাইয়ে দেওয়ার জন্য একটি সুপরিকল্পিত জালিয়াতির চক্র গড়ে তোলা হয়েছিল।
গত ২০২৫ সালের ৩ জুন কুইবেক ও অন্টারিওতে চারটি স্থানে অভিযান চালিয়ে নথি ও কম্পিউটার সরঞ্জাম জব্দ করে সিবিএসএ-র তদন্ত দল। জালিয়াতির এই বিশাল পরিধি ও জটিলতা বিবেচনা করে তদন্তকারীরা সবচেয়ে বেশি প্রমাণযোগ্য ৭৯টি ভিসার আবেদনের ওপর বিশেষ নজর দেন।
যেসব অভিযোগে মামলা হয়েছে
তদন্তে প্রাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মোট তিনটি গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে:
১. ইমিগ্রেশন অ্যান্ড রিফিউজি প্রটেকশন অ্যাক্ট-এর ১১৭(১) ধারার বিধান লঙ্ঘন করে এক বা একাধিক ব্যক্তিকে কানাডায় প্রবেশে সহায়তা বা সংগঠিত করার ষড়যন্ত্র করা, যা আইনটির ১১৭(৩) ধারার অধীন একটি অপরাধ।
২. জেনেশুনে অভিবাসন আবেদনে ভুল তথ্য বা গোপনীয়তা বজায় রাখতে প্ররোচিত করা বা সহায়তা করা, যা আইআরপিএ-র ১২৬ ধারার লঙ্ঘন এবং ১২৮(এ) ধারার অধীন শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
৩. জেনেশুনে অভিবাসন আইন বা আইআরপিএ লঙ্ঘন করতে উৎসাহিত বা সহায়তা করা, যা আইনটির ১৩১ ধারা অনুযায়ী ১১৭(৩) ধারার অধীন অপরাধ হিসেবে গণ্য।
অবশ্য আদালতের আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই অভিযোগগুলো চূড়ান্তভাবে যাচাই করা হবে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
জননিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী গ্যারি আনন্দাসঙ্গারি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, কানাডার অভিবাসন ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে সততা, ন্যায়পরায়ণতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধার ওপর প্রতিষ্ঠিত। যারা প্রতারণার উদ্দেশ্যে আমাদের সিস্টেমকে শোষণ বা ক্ষতিগ্রস্ত করতে চায়, তাদের কঠোর পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। সীমান্ত রক্ষা ও এর সুরক্ষায় সিবিএসএ কর্মীদের পরিশ্রমী ভূমিকার জন্য আমি তাদের ধন্যবাদ জানাই।
সিবিএসএ-র কুইবেক অঞ্চলের আঞ্চলিক মহাপরিচালক এরিক লাপিয়ের বলেন, এই তদন্ত প্রমাণ করে যে কানাডার অভিবাসন ব্যবস্থাকে অপব্যবহার করতে চাওয়া চক্রগুলোকে শনাক্ত ও ধ্বংস করতে সিবিএসএ বদ্ধপরিকর। আমাদের অপরাধ তদন্তকারীদের অসামান্য কাজের প্রশংসা করতে হয়, যা অভিবাসন কর্মসূচির প্রতি জনস্বার্থ রক্ষা করতে সহায়তা করে।


