...|...|...

সারাদেশ

এসিল্যান্ডের স্বাক্ষর জাল করে খাসজমি বন্দোবস্ত, বিল উত্তোলনেও অনিয়ম

রিপন ইসলাম শেখ, নীলফামারী
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, সন্ধ্যা ৬:২০ | আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৬, সন্ধ্যা ৬:৩৯
Shares
এসিল্যান্ডের স্বাক্ষর জাল করে খাসজমি বন্দোবস্ত, বিল উত্তোলনেও অনিয়ম

কিশোরগঞ্জ উপজেলা ভূমি অফিস। ছবি: টাইমস টুডে

সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ডের মাতৃত্বকালীন ছুটির সুযোগ নিয়ে নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলা ভূমি অফিসে গড়ে উঠেছে বিশাল এক জালিয়াতি সিন্ডিকেট। কর্মকর্তার অগোচরে তার স্বাক্ষর জাল করে কৃষি খাসজমি বন্দোবস্তের ভুয়া রেজুলেশন তৈরি, মিসকেস নিষ্পত্তি, ডিসিআর ইস্যু এবং এমনকি সরকারি কোষাগারের অর্থ উত্তোলনের মতো চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) তনিমা জামান তন্বীর লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ভূমি অফিসের ভেতরে গড়ে ওঠা এই ভয়াবহ প্রতারণার চিত্র। অভিযোগের মূল তির কার্যালয়ের উপপ্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমানের দিকে। তাকে এই অপকর্মে প্রত্যক্ষ সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে বাহাগিলি ও নিতাই ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপসহকারী কর্মকর্তা শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে।

নথি পর্যালোচনায় জানা যায়, এসিল্যান্ড তনিমা জামান তন্বী মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকার সময় উপপ্রশাসনিক কর্মকর্তা মিজানুর রহমান কোনো সভা অনুষ্ঠান ছাড়াই কৃষি খাসজমি বন্দোবস্তের ভুয়া রেজুলেশন প্রস্তুত করেন। ২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর এবং ২৫ নভেম্বরের ভুয়া তারিখ ব্যবহার করে তৈরি করা এসব নথির মাধ্যমে নীলফামারী জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ৬টি খাসজমির বন্দোবস্ত অনুমোদন করিয়ে নেওয়া হয়।

শুধু বন্দোবস্তেই ক্ষান্ত হয়নি এই চক্র। ২০২৬ সালের ২৭ ও ২৮ জানুয়ারি এসিল্যান্ডের স্বাক্ষর জাল করে ২৫টি মিসকেস নিষ্পত্তি দেখানো হয় এবং ডিসিআর বহিতে স্বাক্ষর করে তা গ্রহীতাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। একইসাথে রেন্ট সার্টিফিকেট রেজিস্টারে ১৩টি মামলায় ভুয়া স্বাক্ষর করা হয়। এ ছাড়া ২২ ও ২৮ জানুয়ারি ভুয়া বিলে জাল স্বাক্ষর দেখিয়ে সরকারি কোষাগার থেকে মোট ৩১ হাজার ৪৭০ টাকা তুলে আত্মসাৎ করা হয়।

কৃষি খাসজমি নীতিমালা অনুযায়ী কেবল প্রকৃত ভূমিহীনদের মধ্যেই জমি বণ্টনের নিয়ম থাকলেও এখানে ঘটেছে তার উল্টো। সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা যায়, খাসজমি পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে নুরনবী ইসলাম এবং শহিদুল ইসলাম নামে দুই ব্যক্তি বিপুল সম্পদের মালিক।

এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, নুরনবী ও শহিদুল কেউই ভূমিহীন নন; গ্রামে তাদের আলিশান পাকা বাড়ি এবং নিজস্ব গাড়ি রয়েছে। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ভুয়া কাগজপত্র সাজিয়ে তাদের নামে খাসজমি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে।

বন্দোবস্ত পাওয়া নুরনবী ইসলাম বলেন, আমরা নিয়ম মেনেই আবেদন করেছিলাম। ভূমি অফিসের লোক যা কাগজপত্র চেয়েছে, তা-ই দিয়েছি। কোনো সই জাল বা অনিয়ম হয়েছে কিনা, তা অফিসের বিষয়; আমরা কিছু জানি না। তবে মিজান আমাকে প্রায় দেড় বছর ঘুরিয়েছে। আমি ঢাকায় খেটে খাওয়া মানুষ; আমার জমানো যা টাকা ছিল, সবই তাকে দিয়ে আজ নিঃস্ব হয়ে গেছি। সে আমাকে পথে বসিয়ে দিয়েছে। আমরা যুগ যুগ ধরে এই জমিতে আছি, তাই ভূমিহীন হিসেবে যেন বরাদ্দ পাই আপনার সহযোগিতা কামনা করছি।

অনুমোদিত খাসজমি পাওয়া আরেক সুবিধাভোগী বলেন, আমরা ভুয়া বা আসল রেজুলেশন বুঝি না। ভূমি অফিসের লোক আমাদের বলেছিল কাজ হয়ে যাবে, খাসজমি পাব। তারা যে কাগজে সই করতে বলেছে, আমরা তাতেই করেছি। এর জন্য তাদের বেশ কিছু টাকাও দিতে হয়েছে। এখন শুনছি এসব নাকি জাল।

প্রকৃত ভূমিহীন ভিকটিমরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা বহু বছর ধরে দরখাস্ত দিয়ে ভূমি অফিসে ঘুরছি, আমাদের জমি দেওয়া হয় না। আর যারা টাকা দিয়েছে, এসিল্যান্ড ম্যাডাম ছুটিতে থাকার সুযোগে তাদের নামে গোপনে খাসজমি বরাদ্দ দেখিয়ে কাগজ বানিয়ে ফেলা হয়েছে। আমরা এই জালিয়াত চক্রের কঠিন শাস্তি চাই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মচারী জানান, ম্যাডাম ছুটিতে যাওয়ার পর থেকেই মিজানুর রহমান ও শহিদুল ইসলাম খাসজমির ফাইল নিয়ে গোপনে কাজ করতেন। অফিসের রেজিস্টার খাতাগুলো বেশির ভাগ সময় তাদের কাছেই থাকত। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে বলতেন ‘উপরের নির্দেশে কাজ হচ্ছে’। বিল উত্তোলনের সময়ও অফিসের কোনো ক্যাশিয়ার বা সংশ্লিষ্ট কাউকেই জানানো হয়নি। চাকরিতে আমার বয়স মাত্র ২-৩ মাস হওয়ায় তাদের সাথে পেরে উঠিনি। পরবর্তীতে তারা যখন ১৫ লাখ টাকার বিনিময়ে একটি এবং ১৭ লাখ টাকার বিনিময়ে আরেকটি ভুয়া বন্দোবস্ত পার করার চেষ্টা করেন, তখন বিষয়টি আমি ঊর্ধ্বতন স্যারকে জানাই। এরপরই পুরো ঘটনা জানাজানি হয়।

অভিযোগের বিষয়ে উপপ্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান সব দাবি অস্বীকার করে বলেন, আমার কোনো সম্পৃক্ততা নাই। আমি কখনো ফাইল ডিলিংয়ের কাজ করিনি। আমি ফাইল সহকারীও ছিলাম না। কম্পিউটার-সংক্রান্ত কোনো কাজের বিষয়ে আমার জ্ঞান ছিল না। এসব কাজ সার্ভারের দায়িত্বে ছিল। আমি তাদের কাছে যা সত্য, তা-ই বলেছি। আমি বলেছি, এসব বিষয়ে আমি কিছু জানি না এবং এই কাজের সাথে আমি জড়িতও ছিলাম না। বরং সার্ভারই এসব কাজ করেছেন। তারাই আমার নাম বলেছেন, অথচ তারা আমাকে ভালোভাবে চেনেনও না।

আমি নুরনবীকে চিনতাম না। নুরনবী নাকি সার্ভারকে টাকা দিয়েছিলেন এবং সার্ভার আবার ইউএনও স্যারের কাছে বিষয়টি স্বীকার করেছেন এমন কথা শুনেছি। এ ধরনের কিছু কাগজপত্র আগের সাংবাদিকদেরও দেওয়া হয়েছিল বলে শুনেছি। কথিত আছে, ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে সার্ভার এসব কাজ করেছিলেন। পরে ইউএনও স্যার ওই টাকা নুরনবীকে ফেরত দিয়েছিলেন বলেও শুনেছি। তবে এসব বিষয়ে আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই; আমি লোকমুখে শুনেছি।

আমি ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত কিশোরগঞ্জ উপজেলা ভূমি অফিসে কর্মরত ছিলাম। সেখানে উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও নাজির হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। তবে ওই পদে থাকাকালে ফাইল-সংক্রান্ত এসব কাজ আমার দায়িত্বে ছিল না। আমি সেখান থেকে চলে আসার পর তারা ফাইলগুলো দেখাশোনা করতেন।

সহযোগী অভিযুক্ত উপসহকারী কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম দাবি করেন, আমি কোনো অনিয়মের সাথে যুক্ত নই। প্রশাসনিক নির্দেশনার বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত কিছু করিনি।

অভিযোগকারী এসিল্যান্ড তনিমা জামান তন্বী বলেন, আমি মাতৃত্বকালীন ছুটি থেকে ফিরে নথিপত্র পর্যালোচনা করতে গিয়ে স্তম্ভিত হয়ে যাই। আমার অগোচরে ও অনুপস্থিতিতে স্বাক্ষর জাল করে খাসজমি বন্দোবস্ত, মিসকেস নিষ্পত্তি, ডিসিআর প্রদান এবং ভুয়া বিলে স্বাক্ষর দেখিয়ে সরকারি টাকা তোলা হয়েছে। সরকারি নথির স্বচ্ছতা রক্ষা ও জালিয়াত চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমি সমস্ত প্রমাণাদিসহ জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ জানিয়েছি।

কিশোরগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুর রহমান বলেন, এসিল্যান্ড মহোদয়ের লিখিত অভিযোগের বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছি। সরকারি অফিসে জালিয়াতি বা স্বাক্ষর জালের কোনো সুযোগ নেই। নথিপত্র ও রেজিস্টার খাতা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নীলফামারীর জেলা প্রশাসক হুমায়ন কবির এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে বলেন, ভূমি অফিসের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা রক্ষায় সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। এসিল্যান্ডের স্বাক্ষর জাল করে খাসজমি বন্দোবস্ত ও টাকা উত্তোলনের অভিযোগটি আমলে নিয়ে তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর দোষীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার গ্রহন করা হবে।

একটি উপজেলা ভূমি অফিসে একই সাথে খাসজমি বন্দোবস্ত, মিসকেস, ডিসিআর ও বিল রেজিস্টারে একের পর এক স্বাক্ষর জালের ঘটনা শুধু প্রশাসনিক শৃঙ্খলাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং সাধারণ মানুষের ভূমির অধিকারকেও মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলে। মূল নথিপত্র, স্বাক্ষরের ফরেনসিক পরীক্ষা এবং ব্যাংকের লেনদেন রেকর্ড নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করলেই পুরো সত্য উন্মোচিত হবে।