...|...|...

লাইফস্টাইল

একসময় গোলাপি ছিল ছেলেদের পছন্দের রং

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, দুপুর ১২:৫৩ | আপডেট: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ৩:৫৭
Shares
একসময় গোলাপি ছিল ছেলেদের পছন্দের রং

ছবি: এআই জেনারেটেড

গোলাপি বা পিংক দেখলেই এখন আমাদের মনে ভেসে ওঠে মেয়েদের পোশাক, পুতুল কিংবা রাজকন্যার গল্প। অথচ ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এই সমীকরণ একেবারেই সাম্প্রতিক এক সামাজিক নির্মাণ।

মাত্র এক শতাব্দী আগেও পরিস্থিতি ছিল উল্টো, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে গোলাপিকে বরং ছেলেদের জন্যই বেশি উপযুক্ত মনে করা হতো।

যখন শিশুদের পোশাকে রং বলতে কিছুই ছিল না

ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে সব শিশুকেই সাদা রঙের পোশাক পরানো হতো। ফ্যাশন ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির মিউজিয়াম পরিচালক ভ্যালেরি স্টিলের মতে, অষ্টাদশ শতাব্দীতে উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলে ও মেয়ে উভয়েই একই রকম গোলাপি, নীল কিংবা অন্যান্য রং সমানভাবে পরত। সাদা পোশাকের পেছনে কারণ ছিল নিতান্তই ব্যবহারিক- ডায়াপার পরিবর্তনের সুবিধা এবং প্রয়োজনে সহজে ব্লিচ করে পরিষ্কার করা যেত বলে এই রং জনপ্রিয় ছিল।

মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পোশাক-ইতিহাসবিদ জো বি. পাওলেত্তি, যিনি ‘Pink and Blue: Telling the Girls From the Boys in America’ বইয়ের লেখক, তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে প্যাস্টেল রং শিশুদের পোশাকে জনপ্রিয় হতে শুরু করলেও তখনও তা কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গের সাথে যুক্ত হয়নি।

ছবি: সংগৃহীত

এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাংকলিন ডেলানো রুজভেল্টের দুই বছর বয়সের একটি বিখ্যাত ছবিতে দেখা যায়, তিনি সাদা স্কার্ট আর কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুলে সজ্জিত- ১৮৮৪ সালে যা ছিল ছোট ছেলেদের জন্য একেবারেই স্বাভাবিক পোশাক। ভিক্টোরীয় যুগে সামাজিক রীতি অনুযায়ী ছেলেরা ৬-৭ বছর বয়স পর্যন্ত পোশাক (dress) পরত, তারপর প্যান্ট পরার মধ্য দিয়ে তাদের বড় হয়ে ওঠার একটি আনুষ্ঠানিকতা পালিত হতো।

গোলাপি যখন ছিল ছেলেদের রং

১৯ শতকের শেষ দিকে ও ২০ শতকের গোড়ায় কিছু প্রতিষ্ঠান শিশুদের পোশাক ও সামগ্রী বিক্রি বাড়াতে রঙের ভিত্তিতে লিঙ্গভেদ করার কৌশল নিতে শুরু করে। তবে সেই প্রাথমিক পর্যায়ে নিয়মটা ছিল আজকের ঠিক বিপরীত।

১৯১৮ সালের জুন মাসে প্রকাশিত শিশুদের পোশাকবিষয়ক বাণিজ্যিক সাময়িকী ‘আর্নশস ইনফ্যান্টস ডিপার্টমেন্ট’- এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে সাধারণভাবে স্বীকৃত নিয়ম হলো ছেলেদের জন্য গোলাপি আর মেয়েদের জন্য নীল, কারণ গোলাপি অপেক্ষাকৃত দৃঢ় ও জোরালো রং বলে তা ছেলেদের জন্য বেশি মানানসই, আর নীল কোমল ও সূক্ষ্ম হওয়ায় মেয়েদের জন্য অধিক সুন্দর বলে বিবেচিত হতো।

ছবি: সংগৃহীত

কালার এক্সপার্ট ও প্যান্টোন কালার ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক লিয়াট্রিস আইজম্যানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এর পেছনে যুক্তি ছিল- গোলাপি যেহেতু লালের একটি হালকা রূপ, আর লাল রংকে বরাবরই তীব্র, আবেগঘন ও আক্রমণাত্মক রং হিসেবে দেখা হতো, তাই তা ছেলেদের সাথেই বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করা হয়েছিল। 

অন্যদিকে নীলকে আকাশ ও দিনের আলোর সাথে সম্পর্কিত করে কোমল ও নমনীয় রং হিসেবে ধরা হতো, যা মেয়েদের জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচিত হতো। কারো কারো মতে নীলের সাথে কুমারী মেরির প্রথাগত সংযোগও এই ধারণার একটি কারণ হতে পারে। এমনকি এই ধারণার শিকড় আরও পুরনো- ত্রয়োদশ শতাব্দীতে চিত্রশিল্পী দুচ্চিও শিশু যিশুকে গোলাপি পোশাকে অঙ্কন করেছিলেন।

কখন এবং কেন বদলে গেল রঙের সমীকরণ

১৯২০- এর দশক থেকে বিভিন্ন ব্র্যান্ড ও দোকান ভিন্ন ভিন্নভাবে রং নির্ধারণ করতে থাকে- কেউ ছেলেদের জন্য গোলাপি বলত, কেউ আবার মেয়েদের জন্য। ফলে সে সময় কোনো সর্বজনীন নিয়ম প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

১৯২৭ সালে টাইম ম্যাগাজিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রধান দোকানের তথ্যের ভিত্তিতে একটি তালিকা প্রকাশ করে, যেখানে দেখানো হয় মেয়েদের জন্য নীল আর ছেলেদের জন্য গোলাপিই তখনও অধিকাংশ দোকানের সুপারিশ।

আসল পরিবর্তন আসে চল্লিশের দশকে। ব্রিটানিকার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪০- এর দশকের বেবি বুমার প্রজন্মই প্রথম আজকের পরিচিত লিঙ্গভিত্তিক পোশাকরীতিতে বড় হয়- ছেলে ও মেয়েদের ছোট আকারের প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ-নারীর মতো করে সাজানো শুরু হয়, আর গোলাপি হয়ে ওঠে মেয়েদের, নীল ছেলেদের রং।

ঠিক কী কারণে প্রস্তুতকারকেরা এই সময় গোলাপিকে মেয়েলি বলে চূড়ান্ত করেছিল, তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা ইতিহাসবিদদের কাছেও স্পষ্ট নয়।

ছবি: সংগৃহীত

সত্তরের দশকে নারী স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রভাবে পরিস্থিতি আবার বদলাতে থাকে। আন্দোলনের সাথে যুক্ত অনেকে মনে করতেন, শৈশব থেকেই মেয়েদের নির্দিষ্ট ধাঁচের ‘মেয়েলি’ পোশাকে অভ্যস্ত করে তোলা তাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে দিতে পারে। ফলে এই সময় অনেক অভিভাবক লিঙ্গনিরপেক্ষ রং ও পোশাক বেছে নেওয়া শুরু করেন, এবং গোলাপিকে সচেতনভাবেই এড়িয়ে চলার প্রবণতা দেখা যায়।

তবে আশির দশকে এসে গোলাপি-নীলের এই বিভাজন আবার জোরালোভাবে ফিরে আসে, এবং এবার তা আরও স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর একটি বড় কারণ ছিল প্রি-নেটাল টেস্টিং বা গর্ভাবস্থায় সন্তানের লিঙ্গ আগেভাগে জানার প্রযুক্তির প্রসার।

সন্তান জন্মের আগেই তার লিঙ্গ জানতে পারায় বাবা-মায়েরা নার্সারি সাজানো, পোশাক কেনা ও অন্যান্য সামগ্রী নির্দিষ্ট রঙে বাছাই করতে শুরু করেন। প্রস্তুতকারকেরাও এই সুযোগ কাজে লাগায়- কারণ এতে সন্তান ছেলে বা মেয়ে যা-ই হোক, বাবা-মাকে সন্তানের লিঙ্গ অনুযায়ী নতুন করে পোশাক ও সামগ্রী কিনতে বাধ্য করা সম্ভব হয়।

ধীরে ধীরে এভাবেই গোলাপি মেয়েশিশুর আর নীল ছেলেশিশুর প্রতীক হিসেবে বাজারে ও সংস্কৃতিতে স্থায়ী আসন করে নেয়।

গোলাপি রং, বিপণন কৌশল ও ‘পিংক ট্যাক্স’

গোলাপি একবার মেয়েদের সাথে দৃঢ়ভাবে যুক্ত হয়ে গেলে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো এই প্রবণতাকে পুঁজি করে বিপণন কৌশল সাজাতে শুরু করে। সাইকেল, স্কুটার, খেলনা, রেজর থেকে শুরু করে কলম পর্যন্ত- একই পণ্যের গোলাপি সংস্করণ আলাদাভাবে ‘মেয়েদের জন্য’ বাজারজাত করা হতে থাকে। এই প্রবণতা থেকেই উঠে আসে ‘পিংক ট্যাক্স’ শব্দবন্ধ।

পিংক ট্যাক্স আসলে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কর নয়, বরং এটি এমন এক পরিস্থিতিকে বোঝায় যেখানে নারীদের জন্য বাজারজাত করা পণ্য- যেমন রেজর, ডিওডোরেন্ট বা সাজসজ্জার সামগ্রী- কার্যত পুরুষদের জন্য তৈরি প্রায় অভিন্ন পণ্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হয়, যদিও উপাদান বা গুণগত মান প্রায় একই থাকে।

ছবি: সংগৃহীত

নিউইয়র্ক সিটি ভোক্তা বিষয়ক বিভাগের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, নারীদের জন্য বাজারজাত করা পণ্য গড়ে পুরুষদের পণ্যের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হয়। 

যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯৪ সালের এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, একই ধরনের পণ্য ও সেবার জন্য নারীদের বছরে পুরুষদের তুলনায় প্রায় ১,৩৫১ ডলার বেশি খরচ করতে হয়। এছাড়া বেশ কিছু অঙ্গরাজ্যে স্যানিটারি পণ্যকে বিলাসদ্রব্য হিসেবে গণ্য করে সাধারণ কর আরোপ করা হয়, যাকে আলাদাভাবে ‘ট্যাম্পন ট্যাক্স’ বলা হয়।

যদিও কিছু গবেষণায় এই মূল্যবৈষম্যের ব্যাপ্তি নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে- যেমন এক গবেষণায় দেখা গেছে নারীদের ডিওডোরেন্ট পুরুষদের তুলনায় বেশি দামি হলেও, নারীদের ডিসপোজেবল রেজর বরং তুলনামূলক সস্তা।

গোলাপি কি সত্যিই মেয়েদের ‘স্বাভাবিক’ পছন্দ?

সামাজিক বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গোলাপি ও নীলের মধ্যেকার এই লিঙ্গভিত্তিক বিভাজন জৈবিক কোনো সহজাত প্রবণতা নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে সমাজ, সংস্কৃতি, পরিবার ও বাজারের প্রভাবে গড়ে ওঠা একটি সামাজিক নির্মাণ।

ইতিহাসের ধারা যদি ভিন্ন পথে এগোত, তাহলে হয়তো আজ গোলাপি নয়, নীলই হতো মেয়েদের ‘চিরায়ত’ প্রিয় রং- আর গোলাপি বহাল থাকত ছেলেদের রং হিসেবেই।

তথ্যসূত্র: CNN, Smithsonian Magazine, Britannica, The Vintage News, University of Maryland (Jo B. Paoletti-র গবেষণা), Jezebel, British Columbia Medical Journal এবং পিংক ট্যাক্স সংক্রান্ত তথ্যের জন্য Chase, NOW, U.S. News।