আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস আসে, আবার চলে যায়। কিন্তু ১২ বছর ধরে অপেক্ষার প্রহর শেষ হয় না রওশন আরা বেগমের। তার কাছে দিন-তারিখের হিসাবের চেয়েও বড় হয়ে আছে একটি প্রশ্ন- তার ছেলে মাহবুবুর রহমান রিপন কোথায়? বেঁচে আছেন, নাকি আর কখনো ফিরবেন না? কোনো নিশ্চিত উত্তর নেই। আছে শুধু স্মৃতি, অপেক্ষা আর বুকভরা কষ্ট।
রবিবার (৩০ আগস্ট) আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ফেনীতে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে মানববন্ধন ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সেখানে দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ স্বজনদের ফিরে পাওয়ার আকুতি জানান পরিবারের সদস্যরা। প্রিয়জনের সন্ধান, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি ওঠে। আর সেই দাবির ভিড়ে সবচেয়ে ভারী হয়ে ওঠে এক মায়ের কান্না- রিপনের মা রওশন আরা বেগমের কান্না।
১২ বছর আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়ার পর থেকে যুবদল নেতা মাহবুবুর রহমান রিপনের আর কোনো সন্ধান পাননি বলে জানান তার পরিবার। রওশন আরা বেগম বলেন, ছেলেকে কোথায় নেওয়া হয়েছিল, তিনি এখন কোথায় আছেন কিংবা তার সাথে কী ঘটেছে- কোনো প্রশ্নেরই উত্তর মেলেনি। এক যুগ ধরে সন্তানের অপেক্ষায় আছেন তিনি।
রওশন আরা বেগম বলেন, আমার ছেলে কোথায় আছে, বেঁচে আছে কি না- আমরা কিছুই জানি না। একজন মায়ের জন্য এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে? আমি আমার ছেলের সন্ধান চাই, ন্যায়বিচার চাই।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, একজন মানুষ নিখোঁজ হয়ে যাবেন, তার অবস্থান সম্পর্কে পরিবারকে জানানো হবে না, আদালতে হাজির করা হবে না- এমন পরিস্থিতি আইনের শাসন ও মানবাধিকারের জন্য গভীর উদ্বেগের। গুমের অভিযোগে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার বছরের পর বছর যে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে, তারও অবসান প্রয়োজন।
বক্তারা গুম প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয় ভূমিকা আরও জোরদারের পাশাপাশি স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের হাতে গুমের অভিযোগ তদন্তের কার্যকর ক্ষমতা দেওয়ার দাবি জানান। একইসাথে গুমের প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করে নিখোঁজ ব্যক্তিদের প্রকৃত পরিণতি নিশ্চিত করা এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গুমের অভিযোগ তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়।
কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, তারা ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ পেয়েছে। যাচাইয়ের পর ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে জোরপূর্বক গুম হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তিকে মৃত বলে ধারণা করা হয়েছে।
কমিশনের সদস্যদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। ভয়, সামাজিক চাপ ও প্রতিশোধের আশঙ্কায় অনেক পরিবার অভিযোগ না করায় গুমের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি নথির চেয়ে বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে রিপনের মায়ের মতো স্বজনদের কান্না আবারও মনে করিয়ে দেয়- একজন নিখোঁজ মানুষের সাথে শুধু একজন ব্যক্তি হারিয়ে যান না; দীর্ঘ অপেক্ষার যন্ত্রণায় একটি পরিবারও প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে পড়ে। গুমের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, নিখোঁজ ব্যক্তিদের অবস্থান ও পরিণতি সম্পর্কে সত্য উদঘাটন এবং ভুক্তভোগী পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই এখন তাদের প্রধান প্রত্যাশা।
গুমের ঘটনায় স্বজনদের অনিশ্চয়তা শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত সংকট নয়, এটি মানবাধিকার ও আইনের শাসনের সাথেও গভীরভাবে যুক্ত। নিখোঁজ ব্যক্তির অবস্থান, তার সাথে কী ঘটেছে এবং ঘটনার সাথে কারা জড়িত- এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি।
মানববন্ধন ও আলোচনা সভায় অংশ নেওয়া পরিবারগুলোর প্রত্যাশা, রাষ্ট্র তাদের দীর্ঘদিনের কষ্টকে গুরুত্ব দিয়ে দেখবে এবং গুমের প্রতিটি অভিযোগের কার্যকর তদন্ত নিশ্চিত করবে। তারা চান, ভবিষ্যতে কোনো পরিবার যেন একইভাবে প্রিয়জনের অপেক্ষায় বছরের পর বছর কাটাতে বাধ্য না হয়।
রিপনের মা রওশন আরা বেগমের চোখের জল শুধু একটি পরিবারের কষ্টের গল্প নয়; এটি দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকা বহু মানুষের স্বজনের অপেক্ষার প্রতীক। এক যুগ পেরিয়ে গেলেও তার অপেক্ষা শেষ হয়নি। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে তাই তার দাবি একটাই- ছেলের সন্ধান, সত্য উদঘাটন এবং ন্যায়বিচার।



