ইরানের আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি দুটি লুকাস (LUCAS) ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমোজগান প্রদেশের বন্দর খামির এলাকায় ড্রোন দুটি ভূপাতিত করা হয় বলে জানিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী।
ইরানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইআরজিসি জানিয়েছে, তাদের বাহিনী অভিযান চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি লুকাস ড্রোন ভূপাতিত করেছে। তবে ড্রোন দুটি কীভাবে ধ্বংস করা হয়েছে, সেগুলোর ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে কি না কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য এসেছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
লুকাস ড্রোনের পূর্ণরূপ ‘লো-কস্ট আনম্যানড কমব্যাট অ্যাটাক সিস্টেম’ (Low-Cost Uncrewed Combat Attack System)। এটি মূলত একমুখী আক্রমণের জন্য তৈরি চালকবিহীন যুদ্ধযান। অর্থাৎ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার পর ড্রোনটি ধ্বংস হয়ে যায়; ফিরে আসার জন্য তৈরি নয়। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্পেকট্রওয়ার্কস (SpektreWorks) এটি তৈরি করেছে।
ড্রোনটির সবচেয়ে আলোচিত বৈশিষ্ট্য হলো, এর নকশা ইরানের তৈরি শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের আদলে তৈরি। ২০২৫ সালে প্রকাশ্যে আসা এই মার্কিন ড্রোনটি মূলত ইরানের বহুল ব্যবহৃত কামিকাজে ড্রোনের প্রযুক্তি ও নকশা বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয়েছে। সামরিক পরিভাষায় এ ধরনের প্রক্রিয়াকে রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং বলা হয়। ফলে লুকাসকে শাহেদ-১৩৬-এর মার্কিন সংস্করণ বা অনুকরণে তৈরি ড্রোন বলা যায়। তবে দুটি ড্রোনের প্রতিটি যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য অভিন্ন নয়।
শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের মতো লুকাসও তুলনামূলক কম খরচে তৈরি ও পরিচালনা করা যায়। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে বিস্ফোরক বহন করে আঘাত হানা। প্রচলিত অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় কম খরচে এ ধরনের ড্রোন ব্যবহার করা সম্ভব হওয়ায় আধুনিক যুদ্ধে এগুলোর গুরুত্ব বেড়েছে। বিশেষ করে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ড্রোন ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীও ইতোমধ্যে এই ড্রোনের কার্যকর ব্যবহার শুরু করেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মধ্যপ্রাচ্যে লুকাস ড্রোনের একটি স্কোয়াড্রন মোতায়েনের খবর প্রকাশিত হয়। পরে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযানে প্রথমবারের মতো ড্রোনটির যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)।
অন্যদিকে ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোন আন্তর্জাতিক সামরিক অঙ্গনেও ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। ২০২২ সাল থেকে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে এই ড্রোন ব্যবহার করে আসছে। তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয়, দীর্ঘ পাল্লা এবং একমুখী আক্রমণের সক্ষমতার কারণে এটি আধুনিক যুদ্ধের অন্যতম আলোচিত অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের লুকাস ড্রোন তৈরির পেছনেও শাহেদ-১৩৬-এর এই সামরিক কার্যকারিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
এদিকে হরমোজগান প্রদেশে দুটি লুকাস ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি এমন সময়ে সামনে এলো, যখন হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
তবে ইরানের দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর বা সেন্টকমের পক্ষ থেকেও ড্রোন দুটি হারানোর বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে ড্রোন দুটি সত্যিই ভূপাতিত হয়েছে কি না, সেগুলোর ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে কি না এবং কী ধরনের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে—এসব বিষয় এখনো নিশ্চিত নয়।
সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল, এবিসি নিউজ, মিলিটারি টাইমস, সিএসআইএস।


