...|...|...

অর্থনীতি

ই-টিনধারীদের ৫ হাজার টাকা জরিমানা নিয়ে যা জানা জরুরি

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, সন্ধ্যা ৬:৩২
Shares
ই-টিনধারীদের ৫ হাজার টাকা জরিমানা নিয়ে যা জানা জরুরি

ছবি: সংগৃহীত

ই-টিন নিবন্ধন করার পর আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে সবারই ৫ হাজার টাকা জরিমানা হবে-এমন ধারণা সঠিক নয়। আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল না করলে জরিমানা আরোপের বিধান রয়েছে। তবে জরিমানার পরিমাণ নির্ভর করে করদাতার আগের আয় নিরূপণ, রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতার ধরন এবং আইনের প্রযোজ্য শর্তের ওপর।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ই-টিন থাকা সত্ত্বেও আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে ৫ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে-এমন তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে। এতে অনেক করদাতার মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে আইন অনুযায়ী, আগে কখনো আয় নিরূপণ হয়নি-এমন ব্যক্তি করদাতার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্তে সর্বোচ্চ জরিমানা ৫ হাজার টাকা হতে পারে। অন্যদিকে, আগে আয় নিরূপণ হয়ে থাকলে জরিমানার সীমা নির্ধারণের নিয়ম আলাদা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী, রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতার কারণে জরিমানা আরোপের বিধান রয়েছে। তবে ই-টিন থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরিমানা আরোপ করা হয় না। সংশ্লিষ্ট করদাতার পরিস্থিতি বিবেচনায় আইন অনুযায়ী উপকর কমিশনার জরিমানা আরোপ করতে পারেন।

রিটার্ন জমা না দিলে জরিমানা কত?

আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৬৬(১) অনুযায়ী, যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া নির্দিষ্ট ধারার অধীনে রিটার্ন দাখিল করতে ব্যর্থ হলে উপকর কমিশনার জরিমানা আরোপ করতে পারেন।

আইনের বিধান অনুসারে, সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর ধার্যকৃত করের ১০ শতাংশ হারে জরিমানা নির্ধারণ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ন্যূনতম জরিমানা ১ হাজার টাকা। রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে প্রতিদিনের জন্য অতিরিক্ত ৫০ টাকা জরিমানার বিধানও রয়েছে।

তবে জরিমানার সর্বোচ্চ সীমাও আইনে নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে-

আগে আয় নিরূপণ হয়নি: ব্যক্তি করদাতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ জরিমানা ৫ হাজার টাকা।

আগে আয় নিরূপণ হয়েছে: সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর প্রদেয় করের ৫০ শতাংশ অথবা ১ হাজার টাকা-যেটি বেশি, সেই পরিমাণ সর্বোচ্চ জরিমানার সীমা হিসেবে প্রযোজ্য হতে পারে।

অর্থাৎ, ৫ হাজার টাকা সবার জন্য নির্ধারিত জরিমানা নয়। করদাতার পরিস্থিতি ও আইনের শর্ত অনুসারে জরিমানার পরিমাণ নির্ধারিত হয়।

ই-টিন থাকলেই কি রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক?

আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা নির্ভর করে আয়কর আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধানের ওপর। শুধু আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকার কারণে সবাই রিটার্ন দাখিল থেকে অব্যাহতি পাবেন, এমন নয়।

সাধারণভাবে যেসব ব্যক্তি ও শ্রেণির করদাতার রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে, তাদের মধ্যে রয়েছেন-

যাদের বার্ষিক আয় প্রযোজ্য করমুক্ত সীমা অতিক্রম করে;

যাদের ক্ষেত্রে আগের বছরগুলোর আয় নিরূপণ বা কর-সংক্রান্ত নির্দিষ্ট শর্ত প্রযোজ্য;

কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডার কর্মচারী;

সরকারি কর্মচারীসহ আইন দ্বারা নির্ধারিত নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যক্তি;

যাদের নির্দিষ্ট সেবা গ্রহণ বা আইনগত প্রয়োজনে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ দিতে হয়।

এ ছাড়া আইন অনুযায়ী অন্য শ্রেণির ব্যক্তির ক্ষেত্রেও রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক হতে পারে। তাই শুধু ই-টিন আছে কি না কিংবা আয় করযোগ্য কি না-এ দুটি বিষয় বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।

আয়কর রিটার্ন জমার শেষ সময় কখন?

স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতাদের জন্য সাধারণ করদিবস ৩০ নভেম্বর। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কোনো নির্দিষ্ট করবর্ষে সময়সীমা বাড়ালে সংশ্লিষ্ট বর্ধিত সময়সীমা প্রযোজ্য হয়।

২০২৫-২৬ করবর্ষে রিটার্ন জমার সময়সীমা কয়েক দফায় বাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত করা হয়েছিল। তবে আগের করবর্ষের সময়সীমা বর্তমান করবর্ষের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হবে না। চলতি করবর্ষে রিটার্ন জমার সর্বশেষ তারিখ জানতে এনবিআরের বিজ্ঞপ্তি যাচাই করা প্রয়োজন।

নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা দিতে না পারলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। দেরিতে রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কর, অতিরিক্ত অর্থ বা জরিমানার বিষয়টি করদাতার পরিস্থিতি অনুযায়ী যাচাই করতে হবে।

আয় করযোগ্য নয়, কিন্তু ই-টিন আছে-করণীয় কী?

অনেকে ব্যাংকিং সেবা, ঋণ গ্রহণ, সম্পত্তি নিবন্ধন বা অন্যান্য প্রয়োজনে ই-টিন নিবন্ধন করেন। পরবর্তী সময়ে তাদের আয় কমে যেতে পারে কিংবা যে প্রয়োজনে টিআইএন নেওয়া হয়েছিল, সেটির প্রয়োজন নাও থাকতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। বর্তমানে আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকলেই রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা শেষ হয়ে যায় না।

প্রযোজ্য আইনি শর্ত পূরণ হলে টিআইএন বাতিলের জন্য সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা যেতে পারে। তবে আবেদন করলেই টিআইএন বাতিল হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কর্তৃপক্ষের যাচাই ও সিদ্ধান্তের ওপর বিষয়টি নির্ভর করে।

এখানে মনে রাখতে হবে, টিআইএন বাতিলের আবেদন এবং আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা দুটি আলাদা বিষয়।

যেভাবে নিজের রিটার্নের অবস্থা যাচাই করবেন

ই-টিন নেওয়ার পর কোন করবর্ষে রিটার্ন জমা দিয়েছেন, তা নিশ্চিত না হলে কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে পারেন।

১. ই-রিটার্ন পোর্টালে প্রবেশ করুন

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ই-রিটার্ন পোর্টাল etaxnbr.gov.bd-এ প্রবেশ করে নিজের অ্যাকাউন্টে লগইন করুন।

২. রিটার্ন জমার রেকর্ড যাচাই করুন

কোন কোন করবর্ষের রিটার্ন জমা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রাপ্তিস্বীকার বা রিটার্নের রেকর্ড রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করুন।

৩. বকেয়া রিটার্ন থাকলে ব্যবস্থা নিন

যে করবর্ষের রিটার্ন জমা দেওয়া হয়নি, সেটি শনাক্ত করে প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী রিটার্ন দাখিল করুন। দেরির কারণে কোনো কর, অতিরিক্ত অর্থ বা জরিমানা প্রযোজ্য কি না, তা যাচাই করুন।

৪. জরিমানার নোটিশ পেলে কর অফিসে যোগাযোগ করুন

জরিমানার নোটিশ পেলে কোন করবর্ষে এবং কী কারণে জরিমানা আরোপ করা হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট কর সার্কেল থেকে নিশ্চিত করুন। প্রয়োজন হলে কর আইনজীবী বা অভিজ্ঞ কর পরামর্শকের সহায়তা নিন।

অনলাইনে রিটার্ন জমার আগে যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন

অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় সঠিক করবর্ষ নির্বাচন করা এবং আয়, বিনিয়োগ, সম্পদ ও দায়ের তথ্য যথাযথভাবে দেওয়া জরুরি। একই সাথে প্রযোজ্য কর, অগ্রিম কর ও উৎসে কর্তিত করের তথ্যও যাচাই করতে হবে।

রিটার্ন জমা দেওয়ার পর প্রাপ্তিস্বীকার বা সংশ্লিষ্ট রেকর্ড সংরক্ষণ করুন। অপরিচিত ব্যক্তি কিংবা অননুমোদিত ওয়েবসাইটে নিজের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, টিআইএন, পাসওয়ার্ড বা আর্থিক তথ্য দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।