‘আগামীকাল বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাব, দোয়া কইরো মা।’ গত বুধবার রাতে মায়ের সাথে শেষ কথোপকথনে এভাবেই দোয়া চেয়েছিলেন সেনাসদস্য তিতাস শেখ (২৮)। মা রেখা বেগম ছেলের জন্য দোয়া করেছিলেন। কিন্তু সেই অভিযানেই যে চিরতরে হারাতে হবে সন্তানকে, তা কল্পনাও করতে পারেননি তিনি।
পরদিন বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) কক্সবাজারের টেকনাফে মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে যৌথ বাহিনীর অভিযানে সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রাণ হারান তিতাস।
নিহত তিতাস শেখের বাড়ি ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামে। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকালে তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশ। ছেলেকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ বাবা-মা। স্বামীর মৃত্যুর খবরে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার।
নিহত সেনাসদস্যের মা রেখা বেগম জানান, গত বুধবার রাতে ছেলের সাথে তার শেষ কথা হয়েছিল। তখন তিতাস তাকে বলেছিলেন, ‘আগামীকাল বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাব, দোয়া কইরো মা।’ কিন্তু ছেলের সেই কথাই যে শেষ কথা হবে, তা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তিতাস শেখের পরিবারের সাথে সেনাবাহিনীর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। তার বাবা আফজাল শেখ একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য। ছোট ভাই আকরাম হোসেনও বর্তমানে সেনাবাহিনীতে কর্মরত। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিতাস ছিলেন সবার বড়।
২০১৭ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগ দেন তিতাস। সেনাবাহিনীর ১ বীর ইউনিটের সদস্য হিসেবে তিনি টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন।
চার বছর আগে পাশের গ্রামের সুমাইয়া আক্তারের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিতাস। তাদের কোনো সন্তান ছিল না। আগামী ডিসেম্বরে স্ত্রীকে নিজের কর্মস্থলে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। কিন্তু তার আগেই থেমে গেল সব স্বপ্ন।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) জানায়, বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে টেকনাফে মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে যৌথ বাহিনীর অভিযান চলাকালে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলি তিতাসের বুকের বাঁ পাশে লাগে।
গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে লেদা আইআরসি রোহিঙ্গা হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে স্থানান্তর করা হয় রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ)। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ৮টা ৪৮ মিনিটে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
এদিকে স্বামীকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার। অন্যদিকে ছেলের অকালমৃত্যুতে নির্বাক বাবা আফজাল শেখ। চোখের পানি যেন থামছেই না তার।
নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন জানান, সেনাবাহিনীর সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুক্রবার বিকেলে হেলিকপ্টারযোগে তিতাসের লাশ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। পরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনারসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
ছেলের আত্মত্যাগে পরিবার গর্বিত হলেও তার এমন অকালপ্রয়াণ মেনে নিতে পারছেন না স্বজনরা। মায়ের কাছে দোয়া নিয়ে অভিযানে যাওয়া তিতাস আর কখনো ফিরবেন না—এই বাস্তবতায় শোকে স্তব্ধ পুরো পরিবার।



