আজ ১৬ অক্টোবর, বিশ্ব অ্যানেস্থেসিয়া দিবস। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম এক যুগান্তকারী ও মানবতাবাদী আবিষ্কারের দিন। ১৮৪৬ সালের আজকের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে প্রথম সফলভাবে কৃত্রিম উপায়ে রোগীকে অজ্ঞান বা ব্যথামুক্ত করে অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল।
অ্যানেস্থেসিয়া আবিষ্কারের ইতিহাস: নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্তির সূচনা
অ্যানেস্থেসিয়া আবিষ্কারের আগে চিকিৎসকের ছুরি-কাঁচির নিচে যাওয়া মানেই ছিল অবর্ণনীয় কষ্ট ও নরকযন্ত্রণা। সে সময় রোগীকে শক্ত করে বেঁধে, কিংবা মদ বা আফিম খাইয়ে কিছুটা অবশ করে দ্রুত অস্ত্রোপচার শেষ করার চেষ্টা করা হতো। তীব্র ব্যথায় রোগীর চিৎকার ও মৃত্যুর ঘটনা ছিল নিত্যদিনের বিষয়।
এই অন্ধকার অধ্যায়ের অবসান ঘটে ১৮৪৬ সালের ১৬ অক্টোবর। যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালে ডেন্টিস্ট উইলিয়াম টি. জি. মর্টন প্রথমবারের মতো ডায়েটিল ইথার (Diethyl Ether) ব্যবহার করে সবার সামনে সফলভাবে একজন রোগীকে ব্যথামুক্ত বা অজ্ঞান করেন। এরপর সার্জন ড. জন কলিন্স ওয়ারেন ওই রোগীর ঘাড়ের টিউমার সফলভাবে অপসারণ করেন। ব্যথামুক্ত অস্ত্রোপচারের এই অভাবনীয় সাফল্য দেখে ড. ওয়ারেন উদ্বেলিত হয়ে বলেছিলেন— "Gentlemen, this is no humbug!" (ভদ্রমহোদয়গণ, এটি কোনো প্রতারণা নয়!)।
পরবর্তীতে চিকিৎসাবিদ ও লেখক অলিভার ওয়েনডেল হোমস এই প্রক্রিয়ার নাম দেন ‘অ্যানেস্থেসিয়া’ (Anesthesia),যা একটি গ্রিক শব্দ এবং এর অর্থ ‘অনুভূতিহীনতা’।
চিকিৎসা বিজ্ঞানে অ্যানেস্থেসিয়ার গুরুত্ব
অ্যানেস্থেসিয়া কেবল একটি ওষুধ বা প্রক্রিয়া নয়, এটি আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের মেরুদণ্ড। এর গুরুত্ব অপরিসীম:
• জটিল অস্ত্রোপচার সম্ভব করা: অ্যানেস্থেসিয়া ছাড়া মানবদেহের সংবেদনশীল অঙ্গ যেমন— হার্ট, ব্রেন, লিভার বা ফুসফুসের জটিল অস্ত্রোপচার কল্পনাও করা যায় না। রোগীকে শান্ত ও ব্যথামুক্ত রাখার সুবাদেই সার্জনরা নিখুঁতভাবে তাদের কাজ করতে পারেন।
• সার্জারির পরিধি বিস্তার: অঙ্গ প্রতিস্থাপন (Organ Transplant), ক্যানসারের টিউমার অপসারণ এবং রোবোটিক সার্জারির মতো আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পূর্ণভাবে অ্যানেস্থেসিয়ার ওপর নির্ভরশীল।
• নিরাপদ প্রসব নিশ্চিতকরণ: সিজারিয়ান সেকশন বা প্রসবকালীন তীব্র ব্যথা উপশমে (Epidural) অ্যানেস্থেসিয়া কোটি কোটি মায়ের জীবন রক্ষা ও নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করছে।
• দুর্ঘটনা ও ট্রমা ম্যানেজমেন্ট: গুরুতর দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের জরুরি অস্ত্রোপচারের সময় তাৎক্ষণিক শক ও ব্যথা নিয়ন্ত্রণে এটি প্রাণদায়ক ভূমিকা পালন করে।
মানবজাতির জন্য আশীর্বাদ
অ্যানেস্থেসিয়ার আবিষ্কার মানবসভ্যতাকে এক চরম নিষ্ঠুরতা থেকে মুক্তি দিয়েছে। এটি চিকিৎসাকেন্দ্রে রোগীর মানসিক ভয় দূর করেছে এবং চিকিৎসকদের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অ্যানেস্থেসিওলজিস্টদের নিবিড় তত্ত্বাবধানের কারণে আজ অস্ত্রোপচারের টেবিলে মৃত্যুর হার প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
চলতি বছরে বিশ্ব অ্যানেস্থেসিয়া দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— ‘Before, During and Beyond Surgery’। অর্থাৎ, শুধু ওটি (OT) বা অস্ত্রোপচার কক্ষেই নয়, অপারেশনের আগে রোগীর মানসিক প্রস্তুতি এবং অপারেশনের পরে রোগীর আইসিইউ (ICIU) বা এইচডিইউ (HDU) কেয়ার ও সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠা পর্যন্ত প্রতি ধাপে অ্যানেস্থেসিওলজিস্টরা পর্দার আড়ালের নায়ক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন।
মানবজাতির কষ্ট লাঘব এবং আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানকে আজকের এই অনন্য উচ্চতায় নিয়ে আসার পেছনে অ্যানেস্থেসিয়ার আবিষ্কার চিরকাল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক বিপ্লব হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।


