শহরের যানজট কমানো ও দূরপাল্লার যাত্রীদের স্বস্তি নিশ্চিত করতে প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল বোয়ালমারী পৌর বাস টার্মিনাল। কিন্তু উদ্বোধনের প্রায় ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। নিয়মিত বাস চলাচল না থাকায় গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনাটি এখন অনেকটাই অচল। বাসের হর্ন ও যাত্রীদের কোলাহলের বদলে সেখানে দেখা যায় আগাছা, খানাখন্দ, জলাবদ্ধতা ও পড়ে থাকা নির্মাণসামগ্রী। সন্ধ্যা নামলে জনমানবশূন্য টার্মিনাল এলাকায় মাদকসেবীদের আনাগোনাও বাড়ে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ফলে অবহেলা ও অযত্নে ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে জনগণের অর্থে নির্মিত প্রায় ছয় কোটি টাকার এই স্থাপনাটি।
মূল শহর থেকে কিছুটা দূরে হওয়ায় সাধারণ মানুষের অনীহা, পরিবহন মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়ন সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে সরকারি অর্থে নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনাটির নিদারুণ অপচয় হচ্ছে।
জানা যায়, পৌর শহরের অদূরে কাজী সিরাজুল ইসলাম মহিলা কলেজ মোড়ে ১ একর ৩৩ শতাংশ জমির ওপর ৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০২০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে বাস টার্মিনালটি উদ্বোধন করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ ১৯টি পৌরসভা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় এলজিইডি ও বোয়ালমারী পৌরসভা যৌথভাবে বাস টার্মিনাল নির্মাণের কাজ বাস্তবায়ন করে। টার্মিনালের জন্য ১ একর ৩৩ শতাংশ জমি অধিগ্রহণে ব্যয় হয় ৩ কোটি ৫৪ লাখ ৭৯ হাজার ২৩ টাকা। অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হয় আরও ২ কোটি ২০ লাখ ৩৭ হাজার ৬৫২ টাকা। টার্মিনালে সাতটি কাউন্টার বিভিন্ন দূরপাল্লার পরিবহন কোম্পানির অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া হয়।
উদ্বোধনের পর কিছুদিন টার্মিনালটি বেশ জাঁকজমকপূর্ণভাবে সচল থাকলেও সময়ের সাথে এর কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে টার্মিনাল থেকে নিয়মিত দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে টার্মিনালটির বিভিন্ন স্থানে নির্মাণসামগ্রী ও বালুর স্তূপ পড়ে আছে। খানাখন্দ, জলাবদ্ধতা ও বড় বড় ঘাস জন্মে জায়গাটি মানুষের চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। মূল ভবনের আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে মাদক গ্রহণের বিভিন্ন সামগ্রী। সন্ধ্যা নামলে স্থানটি মাদকসেবীদের আনাগোনায় পরিণত হয় বলে জানায় এলাকাবাসী।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, টার্মিনালটি উদ্বোধনের পর গোল্ডেন লাইন, বিআরটিসি, সূর্যমুখী, বিকাশ, সাদ, জাকের, সাউদিয়াসহ কয়েকটি পরিবহনের সেবা ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অদৃশ্য কারণে অন্য পরিবহনগুলো এই রুটে যাত্রীসেবা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। বর্তমানে বোয়ালমারী থেকে শুধুমাত্র গোল্ডেন লাইন পরিবহন ছাড়া অন্য কোনো দূরপাল্লার পরিবহন নিয়মিত সেবা দিচ্ছে না। মাঝে মধ্যে নতুন কোনো পরিবহন চলাচল শুরু করলেও কিছুদিন পর সেটিও আর দেখা যায় না। ফলে একটি নির্দিষ্ট পরিবহনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন যাত্রীরা। এতে প্রতিযোগিতামূলক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে ওঠার সুযোগও সীমিত হয়েছে।
বাস মালিক সিন্ডিকেটের এই আধিপত্যের কারণে টার্মিনাল নির্মাণের মূল উদ্দেশ্যও পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। শহরের যানজট কমানো এবং নির্দিষ্ট একটি স্থানে দূরপাল্লার বাস কাউন্টার ও যাত্রী ওঠানামার ব্যবস্থা থাকলেও বাস্তবে শহরের ছোলনা মাদ্রাসা সংলগ্ন এলাকায় অস্থায়ী কাউন্টারের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। টার্মিনাল থাকলেও সেখানে পরিবহন সেবা না থাকায় যাত্রীরা টার্মিনালমুখী হচ্ছেন না। ফলে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ এবং বাস সিন্ডিকেটের প্রভাবে প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত টার্মিনালটি কার্যকর হওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বোয়ালমারী উপজেলা গোল্ডেন লাইন পরিবহনের কাউন্টারের ম্যানেজার কবির হোসেন বলেন, টার্মিনালে যাওয়ার বিষয়ে মালিকপক্ষকে অবগত করা হয়েছে। আমরা টার্মিনালে না থাকলেও নিয়মিত ভাড়া ও পৌরসভার ট্যাক্স পরিশোধ করছি। টার্মিনালটি দূরে হওয়ায় যাত্রীরা সেখানে যেতে চান না। ফলে সেখানে গেলে আমাদের লোকসানের সম্মুখীন হতে হয়।
বোয়ালমারী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী শেখ আজিজুল হক বলেন, পৌর বাস টার্মিনালটি দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। বৃষ্টি হলে টার্মিনালটির অবস্থা আরও বেহাল হয়ে পড়ে। টার্মিনালটি চালু হলে একদিকে যেমন পৌরসভার আয় বাড়বে, অন্যদিকে শহরের যানজটও নিরসন হবে। তাই টার্মিনালটি চালুর বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানাই।
পৌরসভা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম রকিবুল হাসান বলেন, এখানে যে-সব বাস চলাচল করে, তারা টার্মিনালে যাচ্ছে না। এ কারণে গত ৩ সেপ্টেম্বর সর্বশেষ তাদের লিখিত নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এরপরও যদি তারা টার্মিনালে না যায়, তাহলে তাদের পারমিট বাতিলের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


