...|...|...

জাতীয়

নতুন পে-স্কেল:

অনুমোদন মিললেও প্রজ্ঞাপনে কেন এই দীর্ঘসূত্রিতা?

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১২:২৫ | আপডেট: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকেল ৪:১৩
Shares
অনুমোদন মিললেও প্রজ্ঞাপনে কেন এই দীর্ঘসূত্রিতা?

ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময়ের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে গত ৩১ আগস্ট নতুন বেতনকাঠামো বা পে-স্কেল অনুমোদন করে মন্ত্রিসভা। সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় তৎকালীন পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল এবং সপ্তাহখানেকের মধ্যেই প্রজ্ঞাপন জারির ইঙ্গিত মিলেছিল।

কিন্তু মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন বা গেজেট জারি করা হয়নি। এর ফলে দেশের প্রায় ২৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবীর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া কিছুটা উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ এই প্রক্রিয়ায় হতাশ হওয়ার কিছু নেই, কারণ একটি বিশাল আর্থিক কাঠামোর আইনি প্রশাসনিক রূপ দিতে নির্ধারিত কিছু ধাপ অতিক্রম করতে হয়।

আইন মন্ত্রণালয়ে পৌঁছায়নি খসড়া, যা বলছে অর্থ মন্ত্রণালয়

মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পরপরই বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল যে নতুন বেতনকাঠামোর খসড়াটি যাচাই-বাছাই বা ভেটিংয়ের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে দুই মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে ভিন্ন তথ্য।

আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, গত সপ্তাহে খসড়াটি আসার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত তা তাদের হাতে পৌঁছায়নি। খসড়াটি বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছেই রয়েছে।

বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে খসড়াটি কোথাওআটকেরাখা হয়নি। গেজেট আকারে প্রকাশের আগে যে ধরনের সুক্ষ্ম প্রস্তুতি কারিগরি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন, তা সম্পন্ন করতে কিছুটা সময় লাগছে।

সামরিক বেসামরিক বিভিন্ন খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার হিসাব নির্দেশিকা নিখুঁতভাবে তৈরি করার কাজ চলছে, যা শেষ হলেই দ্রুত ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।

কেন এই দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া?

অতীতে ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল চূড়ান্ত অনুমোদনের ( সেপ্টেম্বর) প্রায় সাড়ে তিন মাস পর (১৫ ডিসেম্বর) গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছিল। অভিজ্ঞ আমলারা বলছেন, মন্ত্রিসভায় সাধারণত মোটাদাগে কোন গ্রেডে কত বেতন বাড়বে, তার একটি মূল প্রস্তাব পাস হয়। এরপর শুরু হয় আসল কর্মযজ্ঞ।

সাবেক সচিব . মো. আনোয়ার উল্ল্যাহর মতে, মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কার ক্ষেত্রে কীভাবে নতুন কাঠামো বাস্তবায়িত হবে, তার বিস্তারিত হিসাব তৈরি করতে হয়। সিভিল প্রশাসনের বাইরে সশস্ত্র বাহিনী (সেনা, নৌ বিমান বাহিনী), পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), সরকারি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের বেতন-ভাতা সুযোগ-সুবিধা কোন প্রক্রিয়ায় কার্যকর হবে, খসড়ায় তার বিস্তারিত বিবরণ থাকতে হয়। আগে থেকে সুনির্দিষ্ট প্রস্তুতি না থাকলে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ শেষ করতে স্বাভাবিকভাবেই বেশ খানিকটা সময় প্রয়োজন হয়।

আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি জানান, খসড়া প্রস্তুত হওয়ার পর তা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সেখানে সংবিধান বা চাকরি সংক্রান্ত অন্যান্য আইনের সাথে প্রস্তাবিত কাঠামোর কোনো বিরোধ আছে কি না, এবং ব্যবহৃত আইনি পরিভাষায় কোনো অস্পষ্টতা রয়েছে কি না, তা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে খতিয়ে দেখা হয়, যাতে ভবিষ্যতে কোনো আইনি জটিলতা তৈরি না হয়।

আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে তা আবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে ফিরে আসে এবং পরবর্তীতে সরকারি মুদ্রণালয় (বিজি প্রেস) থেকে মুদ্রণ সম্পন্ন করে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার মনে করেন, দীর্ঘ সময় পর পে-স্কেল ঘোষণা হওয়ায় চাকরিজীবীদের মধ্যে কিছুটা অধৈর্য কাজ করা স্বাভাবিক। তবে গেজেট প্রকাশের এই জটিল প্রশাসনিক ধাপ পার হতে কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কখনো কখনো মাসও লেগে যেতে পারে। তাই প্রক্রিয়াটি স্বাভাবিক নিয়মেই এগোচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

কার কত বাড়ছে এই নতুন পে-স্কেলে?

এক দশকেরও বেশি সময় পর ঘোষিত এই বেতন কাঠামোতে চাকরিজীবীদের বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে প্রথম থেকে ১১তম গ্রেডের কর্মকর্তাদের বেতন ১০০ শতাংশ পর্যন্ত (দ্বিগুণ) বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে, সর্বনিম্ন গ্রেড বা ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ মূল বেতন লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

মোট তিন ধাপে বাস্তবায়িত হতে যাওয়া এই বেতন কাঠামো চলতি বছরের জুলাই থেকে কার্যকর হবে বলে জানানো হয়েছে। এর ফলে জুলাই মাসের মূল ভিত্তি ধরেই কর্মচারীরা এই বকেয়া সুবিধাসহ পে-স্কেলের সুফল পাবেন। ২৪ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীর এই নতুন বেতন-ভাতা প্রদানে সরকারের বছরে অতিরিক্ত খরচ হবে প্রায় লাখ হাজার কোটি টাকা।

উল্লেখ্য, এর আগে ২০২৫ সালে সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খান-এর নেতৃত্বে গঠিতজাতীয় বেতন কমিশনএবং পরবর্তীতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে প্রধান করে গঠিত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই সরকার এই ঐতিহাসিক পে-স্কেলের অনুমোদন দেয়।