অতিথি আপ্যায়ন ও আতিথেয়তা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। অতিথির প্রতি সম্মান দেখানোর পাশাপাশি অন্যের বাড়িতে মেহমান হিসেবে যাওয়ার সময় কিছু শিষ্টাচার মেনে চলাও জরুরি। একজন মুমিনের আচরণ, সংযম ও সৌজন্য তার ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করে। তাই অন্যের বাড়িতে অতিথি হলে ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী যে ছয়টি আদব মনে রাখা প্রয়োজন, সেগুলো জেনে নেওয়া যাক।
১. সালাম দিয়ে প্রবেশ করা
কারও বাড়িতে গেলে অতিথির প্রথম সৌজন্য হলো সালাম দেওয়া। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘অতএব, যখন তোমরা গৃহে প্রবেশ করবে, তখন পরস্পরের প্রতি সালাম করবে।’ (সুরা নূর, আয়াত: ৬১)
সালাম কোনো সাধারণ অভিবাদন নয়; এটি একটি ইবাদত এবং মুসলিম ভ্রাতৃত্বের প্রকাশ। সালাম মানুষের অন্তরে ভালোবাসা ও বিনয় সৃষ্টি করে, পারস্পরিক দূরত্ব কমায় এবং সম্পর্ককে আরও সুন্দর ও সৌহার্দ্যময় করে তোলে।
২. অনুমতি ও সময় নিশ্চিত করা
ইসলাম মানুষের ব্যক্তিগত জীবন ও গোপনীয়তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেছে। তাই কারও বাড়িতে যাওয়ার আগে অনুমতি নেওয়া এবং সম্ভব হলে সময় নিশ্চিত করে নেওয়া উত্তম।
কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের ঘর ছাড়া অন্য কোনো ঘরে প্রবেশ কোরো না, যতক্ষণ না অনুমতি নাও...।’ (সুরা নূর, আয়াত: ২৭)
এমন সময়ে হঠাৎ কারও বাড়িতে উপস্থিত হওয়া উচিত নয়, যখন তার জন্য অতিথি গ্রহণ করা কষ্টকর হতে পারে। বর্তমান সময়ে একটি ফোনকল বা খুদে বার্তার মাধ্যমে আগেই সময়টি নিশ্চিত করা সহজ।
৩. ক্ষতির কারণ না হওয়া
মেহমানের উপস্থিতি যেন স্বাগতিকের জন্য আনন্দের হয়, কোনোভাবেই যেন তা বোঝা বা ক্ষতির কারণ না হয়—এ বিষয়টি সব সময় মনে রাখা প্রয়োজন। ইসলামে অন্যের ক্ষতি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। (দারাকুতনি, ৩/৭৭, দারুল মাআরিফা, বৈরুত, ২০০৪)
এই মূলনীতি মেহমানদারির ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। নিজের আনন্দ বা সুবিধার জন্য অন্যের শান্তি নষ্ট করা মুমিনের কাজ নয়।
৪. খাবার নিয়ে বাড়াবাড়ি না করা
মেহমানের সামনে খাবার পরিবেশন করা স্বাগতিকের ভালোবাসা ও আতিথেয়তার বহিঃপ্রকাশ। খাবার যত সাধারণই হোক, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আন্তরিকতা। তাই খাবার নিয়ে অযথা প্রত্যাশা করা, তুলনা করা কিংবা সমালোচনা করা অতিথির জন্য শোভন নয়।
হাদিসে এসেছে, ‘নবীজি (সা.) কখনো কোনো খাবারের সমালোচনা করতেন না। কোনো খাবার পছন্দ হলে তিনি তা খেতেন, আর অপছন্দ হলে তা বর্জন করতেন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩২৫৫)
৫. দীর্ঘ সময় অবস্থান না করা
মেহমানদারি যেমন সওয়াবের কাজ, তেমনি মেহমানেরও দায়িত্ব হলো স্বাগতিকের ওপর অযথা চাপ সৃষ্টি না করা। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া দীর্ঘ সময় অবস্থান করা, স্বাগতিকের ব্যক্তিগত সময় ও দৈনন্দিন রুটিন ব্যাহত করা অনুচিত।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে। বিশেষ সমাদর হলো এক দিন এক রাত। আর মেহমানদারি হলো তিন দিন, এরপর যা তা সদকা। আর মেহমানের জন্য বৈধ নয় যে সে তার নিকট থাকবে এবং তাকে কষ্ট দেবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১৩৫)
সময়মতো বিদায় নেওয়াও স্বাগতিকের প্রতি একধরনের সম্মান।
৬. বিদায়ের সময় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা
মেহমান হয়ে কারও বাড়িতে গেলে বিদায়ের সময় স্বাগতিকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। তাঁর সময়, শ্রম, যত্ন ও আতিথেয়তার স্বীকৃতি দেওয়া ইসলামি সৌজন্যেরই অংশ।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তোমাদের প্রতি কোনো উপকার করে, তোমরা তাকে তার প্রতিদান দাও।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৬৭২)
প্রতিদান সবসময় বস্তুগত হতে হবে এমন নয়; আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানানো, দোয়া করা বা সুন্দর কথা বলাও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম। বিদায়ের আগে ‘আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন’-এই ছোট্ট কথাটিও স্বাগতিকের আন্তরিকতার সুন্দর স্বীকৃতি হতে পারে।


