...|...|...

ধর্ম

জুমার দিনে যেসব কাজ থেকে বিরত থাকা জরুরি

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ১১:২৩
Shares
জুমার দিনে যেসব কাজ থেকে বিরত থাকা জরুরি

ছবি: সংগৃহীত

ইসলামে জুমার দিন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ। এ দিনের বিশেষ ফজিলত অর্জনের জন্য নামাজ আদায়ের পাশাপাশি কিছু আমল করার নির্দেশনা রয়েছে। একইভাবে জুমার আদব রক্ষা, অন্য মুসল্লিদের অধিকার বজায় রাখা এবং ইবাদতে মনোযোগী থাকার জন্য কিছু কাজ থেকে বিরত থাকাও জরুরি। জুমার দিনের গুরুত্ব ও পবিত্রতা বজায় রাখতে যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন, সেগুলো তুলে ধরা হলো।

১. জুমার আজানের পর বেচাকেনায় ব্যস্ত থাকা

জুমার নামাজের জন্য আজান দেওয়া হলে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ দুনিয়াবি কাজ ছেড়ে আল্লাহর স্মরণ ও নামাজের দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ রয়েছে।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং বেচাকেনা ছেড়ে দাও।’ (সুরা জুমুআ, আয়াত: ৯)

তাই জুমার নামাজের আহ্বান শোনার পর নামাজের প্রস্তুতি না নিয়ে কেনাবেচা কিংবা অন্য দুনিয়াবি কাজে ব্যস্ত থাকা উচিত নয়।

২. খুতবা চলাকালে কথা বলা ও অমনোযোগী থাকা

জুমার খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা মুসল্লিদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। খুতবা চলার সময় কথা বলা, অন্যের সাথে আলাপ করা কিংবা কাউকে চুপ থাকতে বলাও অনুচিত।

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তুমি যদি জুমার দিন ইমাম খুতবা দেওয়ার সময় তোমার সাথীকে বলো, “চুপ করো”, তবে তুমি অনর্থক কথা বললে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৩৪)

এ সময় শুধু কথাবার্তা নয়, মোবাইল ফোন দেখা কিংবা অপ্রয়োজনে নড়াচড়া করেও মনোযোগ নষ্ট করা থেকে বিরত থাকা উচিত। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি কঙ্কর স্পর্শ করল, সে অনর্থক কাজ করল।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৫৭)

তাই খুতবার পুরো সময় ইমামের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং অপ্রয়োজনীয় কাজ থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন।

৩. অন্য মুসল্লির ঘাড় ডিঙিয়ে সামনে যাওয়া

জুমার নামাজে আগে উপস্থিত হওয়ার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। তবে দেরিতে এসে সামনের কাতারে যাওয়ার জন্য অন্য মুসল্লিদের ঘাড় ডিঙিয়ে যাওয়া বা তাদের কষ্ট দেওয়া উচিত নয়।

এক সাহাবি জুমার দিন মানুষের ঘাড় ডিঙিয়ে সামনে যাওয়ার চেষ্টা করলে রাসুল (সা.) তাকে বলেন, ‘বসে পড়ো, তুমি তো মানুষকে কষ্ট দিয়েছ।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১১১৮)

ইবাদতের ফজিলত অর্জন করতে গিয়ে অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করা সমীচীন নয়। একইভাবে, দুই ব্যক্তির মাঝখানে তাদের অনুমতি ছাড়া বসতেও নিষেধ করা হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘দুই ব্যক্তির মাঝখানে তাদের অনুমতি ছাড়া কেউ বসবে না।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৪৪)

এ ছাড়া আগে থেকে বসে থাকা কাউকে তার জায়গা থেকে উঠিয়ে দিয়ে সেখানে বসাও অনুচিত। এ বিষয়ে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি যেন অন্য ব্যক্তিকে তার বসার স্থান থেকে উঠিয়ে দিয়ে সেখানে না বসে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬২৬৯)

৪. শরীরে বা মুখে দুর্গন্ধ নিয়ে মসজিদে যাওয়া

মসজিদে যাওয়ার আগে শরীর, পোশাক ও মুখের পরিচ্ছন্নতার দিকে খেয়াল রাখা জরুরি। পেঁয়াজ-রসুন, তামাক, জর্দা কিংবা অন্য কোনো কারণে দুর্গন্ধ তৈরি হলে তা দূর করার চেষ্টা করা উচিত, যাতে অন্য মুসল্লিরা অস্বস্তিতে না পড়েন।

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রসুন বা পেঁয়াজ খায়, সে যেন আমাদের মসজিদ থেকে দূরে থাকে এবং নিজের ঘরেই বসে থাকে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৩৫৯)

জুমার দিনের প্রস্তুতি হিসেবে গোসল, মিসওয়াক ও সুগন্ধি ব্যবহারের প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ যখন জুমায় আসবে, সে যেন গোসল করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৭৭)

অন্য এক হাদিসে জুমার দিনের প্রস্তুতি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করে, যথাসাধ্য পবিত্রতা অর্জন করে, তেল বা সুগন্ধি ব্যবহার করে, তারপর জুমার জন্য বের হয়, দুই ব্যক্তির মাঝে গিয়ে তাদের পৃথক না করে এবং তার জন্য নির্ধারিত নামাজ আদায় করে, এরপর ইমাম বের হলে নীরব থাকে, তার এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৮৩)

৫. বিনা ওজরে জুমার নামাজ ছেড়ে দেওয়া

সামর্থ্যবান প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষের ওপর জুমার নামাজ ফরজ। শরিয়তসম্মত কোনো কারণ ছাড়া এ নামাজ ছেড়ে দেওয়া গুরুতর অপরাধ।

রাসুল (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘লোকেরা যেন জুমা ত্যাগ করা থেকে বিরত থাকে, নতুবা আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেবেন, অতঃপর তারা গাফেলদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৬৫)

তবে অসুস্থতা, সফর কিংবা শরিয়তসম্মত অন্য কোনো ওজরের ক্ষেত্রে বিধান ভিন্ন হতে পারে। তাই বৈধ কারণ ছাড়া জুমার নামাজে অবহেলা করা উচিত নয়।

৬. নবীজির ওপর দরুদ পাঠে অবহেলা করা

জুমার দিন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এ দিনের আমলগুলোর মধ্যে দরুদ পাঠও অন্যতম।

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘জুমার দিন তোমরা আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করো।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১০৪৭)

দরুদ পাঠের ফজিলত সম্পর্কে নবীজি (সা.) আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পড়বে, আল্লাহ তার ওপর দশটি রহমত বর্ষণ করবেন।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৯০৬)

তাই জুমার দিনের বরকত ও সওয়াব অর্জনের আশায় বেশি বেশি দরুদ পাঠের আমল করা উচিত।

৭. দোয়া কবুলের বিশেষ সময়কে অবহেলা করা

জুমার দিনে এমন একটি বিশেষ সময় রয়েছে, যখন আল্লাহর কাছে দোয়া করলে তা কবুল হওয়ার সুসংবাদ হাদিসে এসেছে। তাই এ দিন দোয়া ও ইবাদতের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া উচিত।

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘জুমার দিনে এমন একটি সময় আছে, কোনো মুসলিম বান্দা সেই সময়ে নামাজরত অবস্থায় আল্লাহর কাছে কিছু চাইলে আল্লাহ তাকে তা অবশ্যই দেন।’

এরপর তিনি হাতের ইশারায় সময়টি অতি সংক্ষিপ্ত হওয়ার কথা জানান। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৩৫)

হাদিসের ব্যাখ্যায় জুমার দিনের দোয়া কবুলের সম্ভাবনাময় সময় হিসেবে আসরের পর সূর্যাস্তের আগের সময়টির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে সুনানে আবু দাউদে বর্ণনা রয়েছে (হাদিস: ১০৪৮)। তাই দিনের এ সময়টিতে বেশি বেশি দোয়া করা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও কল্যাণ কামনা করা যেতে পারে।

জুমার দিনের মর্যাদা রক্ষায় এসব বিষয়ে সতর্ক থাকার পাশাপাশি নামাজ, দরুদ, দোয়া ও অন্যান্য নেক আমলে মনোযোগী হওয়া উচিত। একই সাথে মসজিদে অন্য মুসল্লিদের স্বস্তি ও অধিকার রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন।