...|...|...

খুলনা

‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়ার মাইকিং, বিকাশ একাউন্ট খুলতে নারীদের হিড়িক

যশোর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ৮:১৮ | আপডেট: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ৮:৪৩
Shares
‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়ার মাইকিং, বিকাশ একাউন্ট খুলতে নারীদের হিড়িক

যশোর শহরের রাজারহাট এলাকায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পাওয়া যাবে-এমন প্রচারণায় একটি কম্পিউটার দোকানে ভিড় করেছেন শত শত নারী। আগের দিন মাইকিং করে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কার্যক্রম চলবে বলে জানানো হয়। ঘোষণার পর বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও টাকা নিয়ে দোকানটিতে আসতে থাকেন নানা বয়সী নারীরা।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, রাজারহাট এলাকার সান কম্পিউটার দোকানের সামনে শত শত নারী ভিড় করেছেন। অনেকের হাতে জাতীয় পরিচয়পত্র ও নগদ টাকা। কেউ কেউ দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। তাদের অনেকেই জানান, আগের দিন মাইকিং শুনে ফ্যামিলি কার্ডের জন্য প্রয়োজনীয় কাজ করাতে তারা এখানে এসেছেন।

ঘটনাস্থলে আসা ঝর্ণা বেগম জানান, ফ্যামিলি কার্ডের জন্য প্রয়োজনীয় কাজ হবে শুনেই তিনি সেখানে এসেছেন।

তিনি বলেন, আইডি কার্ড নিয়ে ব্যাংকে যেতে হবে, বলেছে ফ্যামিলি কার্ড হবে। তাই আসছি। এখন আবার ২৭৫ টাকা দিয়ে সিম কিনতে হচ্ছে। এরপর বিকাশ নম্বর খুলতে হবে।

পারভীন বেগমের বক্তব্যেও উঠে আসে একই ধরনের তথ্য। তার ভাষ্য, মানুষের মুখে মুখে ফ্যামিলি কার্ডের কথা শুনেছেন। পাশাপাশি মাইকিং শুনেও সেখানে এসেছেন।

আয়েশা বেগম বলেন, মাইকে বলা হয়েছিল যাদের নামে সিম নেই, তাদের সিম কিনতে হবে। বিকাশ অ্যাকাউন্ট খুললেই টাকা আসবে-এমন ধারণা নিয়েই তিনি সেখানে এসেছেন।

তিন নারীর বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট-তারা সেখানে ফ্যামিলি কার্ড পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়েই এসেছিলেন।

ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ফ্যামিলি কার্ডের সাথে সিম ও বিকাশ অ্যাকাউন্ট খোলার বিষয়টি কীভাবে যুক্ত হলো।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, যাদের নামে সিম নেই, তাদের নতুন সিম কিনতে বলা হয়। এরপর সেই নম্বরে বিকাশ অ্যাকাউন্ট খোলার কথা বলা হয়।

অভিযোগের বিষয়ে মো. আব্দুল আলিমের বক্তব্য ভিন্ন। তিনি দাবি করেন, ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার জন্য নয়, সরকারি বিভিন্ন ভাতা গ্রহণকারীদের বিকাশ অ্যাকাউন্ট খোলার সুবিধার্থেই ক্যাম্পেইনের আয়োজন করা হয়েছে।

আব্দুল আলিম বলেন, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতাসহ বিভিন্ন সরকারি ভাতার আবেদনকারীদের অনেকের বিকাশ অ্যাকাউন্টে সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধান এবং নতুন অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য ক্যাম্পেইন করা হয়েছে।

তবে তার বক্তব্যেই উঠে আসে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি তথ্য। তিনি জানান, একটি নতুন বিকাশ অ্যাকাউন্ট খোলা হলে কমিশন পাওয়া যায়।

তার দাবি, আমরা ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার জন্য কোনো মাইকিং করিনি। সরকারি ভাতার জন্য বিকাশ অ্যাকাউন্ট খোলা হচ্ছে-এটাই প্রচার করা হয়েছে।

রামনগর ইউনিয়নের ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমের জন্য মনোনীত সুপারভাইজার এনাম আহমেদ জানান, এখনো সদর উপজেলা থেকে ফ্যামিলি কার্ডের কার্যক্রম শুরু করার বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, প্রথমে তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজারদের তিন দিনের প্রশিক্ষণ হবে। এরপর সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সুবিধাভোগীদের বাড়িতে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ ও হালনাগাদ করা হবে।

অর্থাৎ, ফ্যামিলি কার্ডের জন্য কাউকে নির্দিষ্ট কোনো দোকানে এসে সিম কেনা বা বিকাশ অ্যাকাউন্ট খোলার কোনো সরকারি নির্দেশনা এখনো নেই।

এনাম আহমেদের ভাষ্য, ব্যক্তিগত বা আর্থিক স্বার্থে কেউ এমন কাজ করে থাকতে পারেন। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর কথাও বলেন তিনি।

যশোর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার হক জানান, যশোর জেলায় বর্তমানে একটি ইউনিয়ন-চাঁচড়া ইউনিয়নে-ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির পাইলট প্রোগ্রাম সম্পন্ন হয়েছে।

অন্যান্য ইউনিয়নে এখনো সুবিধাভোগীদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়নি বলেও জানান তিনি।

ইউএনও বলেন, অন্যান্য ইউনিয়নে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু হলে ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে জনগণকে জানানো হবে। সরকারি বিধিবিধান মেনেই পুরো কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

রামনগর এলাকায় ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে প্রচারণার বিষয়ে ইতোমধ্যে লোক পাঠিয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। বিভ্রান্তিকর বা বিধিবহির্ভূত প্রচারণা হয়ে থাকলে তা বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরকারি সুবিধার আশায় আসা অসহায় ও বয়স্ক মানুষদের ভুল তথ্য দিয়ে কোনো ব্যবসায়িক সুবিধা নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে প্রশাসনের তদন্তে।

বিষয়টি নিয়ে এলাকায় তৈরি হয়েছে উদ্বেগ ও বিভ্রান্তি। সরকারি কোনো কর্মসূচির নামে সাধারণ মানুষ যাতে প্রতারিত বা হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।