...|...|...

জাতীয়

‘দুই মাস হইছে মাছের গন্ধটাই ভুইল্যা গেছি’

বিবিসি
প্রকাশ: ৬ নভেম্বর ২০২৬, সকাল ১০:০১
Shares
‘দুই মাস হইছে মাছের গন্ধটাই ভুইল্যা গেছি’

ছবি: বিবিসি

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়েনি আয়। বাসাভাড়া, গ্যাস ও বিদ্যুতের বিল মেটানোর পর হাতে থাকছে না প্রয়োজনীয় টাকা। ফলে মাছ-মাংসের মতো খাবার কেনাও কঠিন হয়ে পড়েছে আশুলিয়ার জিরাবো এলাকার পোশাকশ্রমিকদের। জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে হিমশিম খাওয়া এসব শ্রমিক বলছেন, সংসার চালাতে গিয়ে মাসের মাঝামাঝি সময়েই তাদের হাতে টাকা ফুরিয়ে যায়।

জিরাবো বাজারের পাশের একটি ছোট কলোনিতে প্রায় ২০টি ঘর রয়েছে। এসব ঘরে বসবাস করেন স্থানীয় পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে কারখানাগুলো খোলা থাকলেও কলোনির বেশির ভাগ ঘরেই শ্রমিকদের দেখা যায়। কয়েক দিন ধরে চলা বেতন বৃদ্ধির আন্দোলনের কারণে কারখানাগুলোতে কাজের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।

কলোনির একটি ঘরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকেন পোশাকশ্রমিক টুটুল মোল্লা। কয়েক দিন ধরে সকালে কারখানায় গেলেও ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ছুটি হয়ে যাচ্ছে। পরে তাকে বাসায় ফিরতে হচ্ছে।

সংসারের খরচের চাপ তুলে ধরে টুটুল মোল্লা বলেন, ‘সব কিছুর দাম খালি বাড়তেছেই। যেই বেতন পাই তা দিয়ে দুই বেলা খাই, তারপরও অর্ধেক মাসও চলে না। দুই মাস হইছে মাছের গন্ধটাই ভুইল্যা গেছি, গোস্ত খাওয়া হয় শুধু দুই ঈদে।’

কলোনির অন্তত ১০টি শ্রমিক পরিবারের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত এক বছরে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কারণে সংসারের খরচের হিসাব বদলে গেছে। কিন্তু আয় বেড়েছে সামান্যই।

আয় বাড়ছে সামান্য, খরচ কয়েক গুণ

২০২৪ সালে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসে পোশাক কারখানায় কাজ শুরু করেন রহিমা খাতুন। তখন তার মাসিক বেতন ছিল ১২ হাজার ৫০০ টাকা। স্বামীও তখন অন্য একটি কারখানায় কাজ করতেন। দুজনের আয়ে পাঁচ সদস্যের সংসার মোটামুটি চলত। কয়েক মাস আগে স্বামী অসুস্থ হয়ে চাকরি হারালে সংসারের দায়িত্ব একাই সামলাতে হচ্ছে তাকে।

রহিমা খাতুন বলেন, ‘দুই বছরে আমার আয় দেড় হাজার টাকা বাড়ছে। আর সংসারের খরচ বাড়ছে সাত আট হাজার টাকা। এখন এই বেতন দিয়ে আমার সংসার চালাবো কিভাবে।’

কলোনির আরেক বাসিন্দা মনোয়ারা বেগমের মাসিক আয় ১৫ হাজার টাকা। তার হিসাবে, বাসাভাড়া, গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল দিতেই প্রায় ৯ হাজার টাকা চলে যায়। বাকি টাকা দিয়ে খাবারসহ অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে হয়।

তিনি বলেন, "বাজারে এখন শুধু আলু আর কাঁচামরিচ বাদে বাকি সবকিছুর দাম বাড়ছে, আমরা সংসার চালাবো কিভাবে"।

কলোনির শ্রমিকদের অনেকে নির্দিষ্ট কয়েকটি দোকান থেকে বাকিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনেন। মাসের ৭ তারিখ বেতন পাওয়ার পর বাসাভাড়া ও দোকানের বকেয়া পরিশোধ করতেই বড় অংশের টাকা শেষ হয়ে যায়।

শ্রমিক মো. নুরুন্নবী মিয়া বলেন, "মাসের সাত তারিখে বেতন পাই, ১০ তারিখ দোকানের বাকি শোধ করি বাসা ভাড়া দেই। ১৫ তারিখের পর আমাদের হাতে আর কোন টাকা থাকে না। খরচ এত বাড়ছে যে সংসার চালাইতে হিমশিম খাইতেছি"।

গ্যাস-বিদ্যুতের বিল নিয়ে ক্ষোভ

জিরাবোর ওই কলোনির শ্রমিকদের অভিযোগ, গ্যাস ও বিদ্যুতের বাড়তি দাম তাদের সংসারের ব্যয় সবচেয়ে বেশি বাড়িয়েছে। আগে ১২ কেজির একটি গ্যাস সিলিন্ডার কিনতে খরচ হতো ১ হাজার ২০০ টাকার কিছু বেশি। এখন একই সিলিন্ডার কিনতে তাদের অন্তত ২ হাজার ৫০০ টাকা গুনতে হচ্ছে।

পটুয়াখালী থেকে কয়েক বছর আগে ঢাকায় আসা জেসমিন আক্তার আগে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। প্রায় এক বছর আগে চাকরি হারানোর পর এখন তার সংসার চলছে পোশাক কারখানায় কর্মরত ছেলের আয়ে। ছেলের মাসিক বেতন ১৬ হাজার টাকা। মাঝে মাঝে অতিরিক্ত কাজ করে কিছু বাড়তি আয় হলেও তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

জেসমিন আক্তার বলেন, "আমারে চাকরি দিয়া বের করে দিছে। ছেলের বেতন ১৬ হাজার টাকা। মাঝে মাঝে ওভার টাইমে কিছু বাড়তি টাকা আসে। কিন্তু টাকা দিয়া তো সংসার চলে না। আগে গ্যাসে রান্না করতাম, এখন ২৫০০ টাকার নিচে কোন সিলিন্ডার পাওয়া যায় না, বাধ্য হয়ে গ্যাস কেনা বাদ দিচ্ছি, চুলায় রান্না করি"।

রহিমা বেগমের অভিযোগ, দুই বছরে তার বেতন বেড়েছে মাত্র এক হাজার টাকা। অথচ শুধু গ্যাসের দামই বেড়েছে প্রায় দেড় হাজার টাকা।

বিদ্যুৎ বিল নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে শ্রমিকদের মধ্যে। তাদের দাবি, এক বছর আগে প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিল আসত ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। এখন তা বেড়ে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা হয়েছে।

নুরুন্নবী মিয়া বলেন, "আগে কারেন্ট বিল দিতাম ৫০০/৬০০ টাকা। এখন কোন মাসে দেড় হাজার, কোন মাসে দুই হাজার টাকা। এই গ্যাস আর বিদ্যুৎই আমাদের খরচ অনেক বাড়ায়ে দিছে"।

বেতন বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলন

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি বর্তমানে ১২ হাজার ৫০০ টাকা। ২০২৩ সালের নভেম্বরে এই মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল। গত কয়েক দিন ধরে সর্বনিম্ন মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে আশুলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের আন্দোলন চলছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে।

আন্দোলনের কারণে আশুলিয়া-জিরাবো এলাকার অনেক কারখানায় স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। শ্রমিকেরা সকালে কাজে যোগ দিলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ছুটি হয়ে বাসায় ফিরছেন।

শ্রমিক আমিনুর রহমান জানান, কারখানা থেকে দ্রুত ছুটি পাওয়ায় অবসর সময়ে তিনি প্লাস্টিক দিয়ে পাটি বুনছেন।

সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমিক আন্দোলনের পেছনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের ইন্ধন থাকার অভিযোগ করা হয়েছে। তবে শ্রমিকদের বক্তব্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তারা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছেন।

নুরুন্নবী মিয়া বলেন, ‘এই আন্দোলন তো আর এমনিতেই করতেছি না। আগে জিনিসপত্র কম দামে কিনতে পারতাম সংসার চলতো। এখন তো চলে না।’

তিনি আরও বলেন, "সব কিছুর দাম বাড়বে, আর আমাদের বেতন আগের মতো থাকবে, তাহলে আন্দোলন ছাড়া আমাদের আর কী উপায় আছে বলেন। সরকার সব কিছু দাম কমায়ে দিক আমাদের বাড়তি বেতন লাগবে না"।