...|...|...

চট্টগ্রাম

গ্যাস সংযোগহীন মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল, ভরসা এলপিজি

মুহাম্মদ দিদারুল আলম, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকেল ৪:৩১ | আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকেল ৪:৩৬
Shares
গ্যাস সংযোগহীন মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল, ভরসা এলপিজি

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) অধীন অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়নকাজ শুরুর পর প্রায় আট বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো স্থাপন করা হয়নি নিজস্ব গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন। এতে এখানকার বিনিয়োগকারীরা কারখানায় উৎপাদন শুরু করা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।

কারখানার নির্মাণকাজ শেষ করে যন্ত্রপাতি স্থাপন করা বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, গ্যাস সরবরাহ না থাকায় তাদের উৎপাদন কার্যক্রম শুরু পিছিয়ে যাচ্ছে। এতে দেশের বৃহত্তম এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব পড়ছে।

গ্যাস সংযোগ না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের। মিরসরাই ও সীতাকুণ্ড এবং ফেনীর সোনাগাজীতে গড়ে ওঠা এই শিল্পনগরীর আয়তন প্রায় ৩০ হাজার একর। এর মধ্যে বেপজার অধীনে প্রায় ১ হাজার ১৩৮ দশমিক ৫৫ একর জমিতে দুটি পৃথক জোন গড়ে উঠেছে। এর ৫২ শতাংশ জায়গায় জোন-১ এবং বাকি ৪৮ শতাংশে জোন-২। এই দুই জোনে ৫৩৯টি শিল্প প্লট তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে কিছুদিন ধীরগতি থাকলেও বর্তমানে অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিভিন্ন অংশে উন্নয়ন ও নির্মাণকাজে গতি এসেছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ‘তাইমা সুজ বিডি’ নামের চীনা বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করেছে। প্রকল্প কর্মকর্তা আরমান উদ্দিন জানান, এই জোনে তাদের আরও কয়েকটি কারখানা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সংযোগের অভাব অর্থনৈতিক অঞ্চলের অন্যতম বড় সমস্যা। চাহিদা অনুযায়ী জাতীয় গ্যাস সঞ্চালন লাইনের সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য নির্ধারিত পাইপলাইন দীর্ঘ সময়েও নির্মাণ হয়নি। ফলে কিছু কারখানা উৎপাদনে যেতে পারছে না। আবার উৎপাদন চালু রাখা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এলপিজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. কায়সার রহমান বলেন, গ্যাস সংযোগ না থাকায় কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদনে যেতে পারছে না এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আপাতত এলপিজিতে কার্যক্রম চালাচ্ছে।

বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলের ‘খাইশী লিনজেরি বাংলাদেশ লিমিটেড’-এর মানবসম্পদ কর্মকর্তা জামান উল্লাহ জানান, গ্যাসের বিকল্প হিসেবে বর্তমানে প্রায় ৭ থেকে ৮টি প্রতিষ্ঠান এলপিজি ব্যবহার করছে।

জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং পরিকল্পিত শিল্পায়নের লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিদ্যুতের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দ্রুত পাইপলাইন নির্মাণ ও গ্যাস সংযোগ চালু হলে অপেক্ষমাণ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদনে যেতে পারবে বলে আশা করছেন বিনিয়োগকারীরা। একই সাথে বিদ্যমান কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতাও বাড়বে বলে মনে করছেন তারা।

তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. কায়সার রহমান জানান, অর্থনৈতিক অঞ্চলে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ রয়েছে। বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলের শতভাগ চীনা মালিকানাধীন জুতার সামগ্রী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘কেপিএসটি সুজ বিডি’র মানবসম্পদ কর্মকর্তা মমতাজ উদ্দিন তারেক বলেন, কারখানা পরিচালনায় বিদ্যুৎ সংকট নেই। বেপজার তত্ত্বাবধানে নিজস্ব উপকেন্দ্র থেকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকলে বিকল্প হিসেবে জেনারেটর রয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মুখে পড়তে হয় না।

সূত্রমতে, মিরসরাইয়ের সিপি মোড়ে অবস্থিত কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের স্টেশন থেকে এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য প্রাথমিকভাবে ৫ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ নিজস্ব গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। বেপজার পক্ষ থেকে ২৪ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপলাইন স্থাপনের কথা থাকলেও প্রকল্পটি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।

বসুন্ধরা গ্রুপ তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য ১৬ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপলাইন স্থাপন করেছিল। শুরুতে সেখান থেকে বেপজার অর্থনৈতিক অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহের কথা থাকলেও বর্তমানে সেই সুযোগ নেই। ফলে সমস্যার সমাধান হয়নি।

বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ এনামুল হক জানান, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষকে (বেজা) গ্যাস সংযোগের বিষয়ে জানানো হয়েছে।

তিনি বলেন, ইউটিলিটি সেবা নিশ্চিত করতে না পারলে বিনিয়োগ কার্যক্রমের গতি আসবে না। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে সাময়িকভাবে এলপিজি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আরও ৮-১০টি প্রতিষ্ঠানের গ্যাস সংযোগ প্রয়োজন হবে।

অবশ্য সূত্র জানিয়েছে, ওই পাইপলাইন ব্যবহারের বিষয়ে বেজা ও বসুন্ধরা গ্রুপের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

বেপজার নথিপত্রের তথ্যমতে, এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের মোট ৫৩৯টি শিল্প প্লট ও দুটি ছয়তলা কারখানা ভবনের মধ্যে ইতোমধ্যে ৩৫৪টি প্লট এবং একটি কারখানা ভবন ৬১টি কোম্পানিকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কার্যক্রম চালু করে রফতানি শুরু করেছে। তিনটি প্রতিষ্ঠান রফতানি শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে। এছাড়া আরও ৩২টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কারখানা ইউনিট নির্মাণাধীন রয়েছে।

গত এপ্রিল পর্যন্ত এ অঞ্চলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯০ দশমিক ৭৯ মিলিয়ন ডলার। আর রফতানি হয়েছে ৪৫ দশমিক ১৪ মিলিয়ন ডলার। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে ৬ হাজার মানুষের।

চুক্তি স্বাক্ষরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে চীনা বিনিয়োগকারীর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সিঙ্গাপুর, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, নেদারল্যান্ডস, মালয়েশিয়া, আয়ারল্যান্ড ও বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

বেপজার প্রাক্কলন অনুযায়ী, প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে এতে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হবে। পাশাপাশি প্রায় ৪ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

মিরসরাইয়ের জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের আওতায় এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের অনুমোদন দেওয়া হয় ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে। এটিই বেপজার অধীনে থাকা সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অঞ্চল। গত এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ৯৩ শতাংশ।