...|...|...

সারাদেশ

৮০ বছর বয়সেও গলায় গামলা, থামেনি জব্বারের বাদাম বিক্রি

সাকিব মামুন, খাগড়াছড়ি
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১:৩০
Shares
৮০ বছর বয়সেও গলায় গামলা, থামেনি জব্বারের বাদাম বিক্রি

প্রতিদিন গলায় গামলা ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়েন আবদুল জব্বার। ছবি: টাইমস টুডে

বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে। পায়ে সমস্যা, ঠিকমতো হাঁটতেও পারেন না। তবু থেমে থাকার সুযোগ নেই ৮০ বছর বয়সী আবদুল জব্বারের। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন গলায় গামলা ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। সেই গামলায় থাকে ভাজা বাদামের ছোট ছোট প্যাকেট। হাট-বাজার, বিদ্যালয় কিংবা খেলার মাঠ—যেখানে মানুষের ভিড়, সেখানেই দেখা মেলে জব্বারের।

প্রায় তিন দশক ধরে এভাবেই বাদাম বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন তিনি। বয়স তাকে থামাতে পারেনি; থামাতে পারেনি শরীরের দুর্বলতাও।

আবদুল জব্বারের বাড়ি খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার ৫ নম্বর উল্টাছড়ি ইউনিয়নের ওমরপুর গ্রামে। বাড়ি থেকে বাজারের দূরত্ব প্রায় চার কিলোমিটার। প্রতিদিন সেই পথ পাড়ি দিয়ে বাজারে আসেন। এরপর পানছড়ির বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ঘুরে বাদাম বিক্রি করেন। দিন শেষে আবার হেঁটে ফিরতে হয় বাড়িতে। সব মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার পথ হাঁটেন তিনি।

প্রতিদিনের সংগ্রাম শুরু হয় ভোরেই। ঘুম থেকে উঠে নিজ হাতে চুলোয় বাদাম ভাজেন। এরপর পাল্লায় মেপে ২৮ গ্রাম করে ছোট ছোট প্যাকেট তৈরি করেন। গামছা দিয়ে গলায় গামলা ঝুলিয়ে সকাল আটটার আগেই বেরিয়ে পড়েন জীবিকার সন্ধানে। প্রখর রোদ, বৃষ্টি কিংবা ঝড়—কোনো কিছুই সহজে তাকে ঘরে আটকে রাখতে পারে না।

তার আয়ের অন্যতম ভরসা ১০ টাকার একেকটি বাদামের প্যাকেট। সারাদিন হাঁটাহাঁটি করে অল্প অল্প করে বাদাম বিক্রি করেই চলে তার সংসার।

ওমরপুর গ্রামের একটি জরাজীর্ণ ঘরে স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করেন জব্বার। এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে তার। ছেলে পরিবার নিয়ে লালমনিরহাটে থাকেন। নিজের সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হয়, বাবাকে নিয়মিত সহযোগিতা করার সামর্থ্য নেই তার। মেয়ের বিয়ে হলেও জামাই প্রতিবন্ধী। ফলে জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও সংসারের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি মেলেনি জব্বারের।

শরীর আর সায় দেয় না। তবু পেটের দায়ে প্রতিদিন তাকে পথে নামতে হয়।

কথা বলতে গিয়ে আবদুল জব্বার বলেন, ‘শরীরে আর কুলায় না। অনেক কষ্ট হয়। এখন আর পারি না।’

তিনি বলেন, ‘সারাদিন ঘুরেফিরে বাদাম বিক্রি করি। এতে প্রতিদিন প্রায় ২৫ কিলোমিটার হাঁটা হয়। বয়স হয়েছে, বল-শক্তি কমে গেছে। তাই চলতেও কষ্ট হয়। বাদাম নিজেই ভাজি, নিজেই প্যাকেট করি। পাল্লায় ওজন করে ২৮ গ্রাম করে বাদাম দিই। সবার কাছে দোয়া চাই।’

জব্বারের এই জীবনসংগ্রাম এখন শুধু একজন বাদাম বিক্রেতার গল্প নয়; এটি যেন বয়সের কাছে হার না মানা এক মানুষের প্রতিদিনের লড়াই। যে বয়সে স্বজনদের সান্নিধ্যে বিশ্রাম নেওয়ার কথা, সে বয়সে গলায় গামলা ঝুলিয়ে জীবিকার সন্ধানে ছুটছেন তিনি।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, আবদুল জব্বারের কষ্টের জীবনের গল্পটি স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের নজরে আসবে। জীবনের শেষ বয়সে অন্তত একটু স্বস্তি, নিরাপদ আশ্রয় ও সহায়তার ব্যবস্থা হলে হয়তো আর প্রতিদিন ২০-২৫ কিলোমিটার পথ হেঁটে গলায় গামলা ঝুলিয়ে বাদাম বিক্রি করতে হবে না এই প্রবীণ মানুষটিকে।