মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধাতব মুদ্রায় এবার স্থান পেলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিকৃতি। এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে এই প্রথম কোনো জীবিত প্রেসিডেন্টের ছবি প্রচলিত (সার্কুলেটিং) মার্কিন মুদ্রায় জায়গা করে নিল।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) দেশটির ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ জানায়, ট্রাম্পের প্রতিকৃতি সংবলিত সোনালি রঙের নতুন এক ডলারের মুদ্রা বাজারে ছাড়া হয়েছে। এই ঘটনা মার্কিন ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো কোনো জীবিত প্রেসিডেন্টের প্রচলিত মুদ্রায় স্থান পাওয়ার নজির।
মুদ্রার নকশা করেছেন ইউএস মিন্টের চিফ এনগ্রেভার জোসেফ মেনা, যা তৈরি হয়েছে হোয়াইট হাউসের আলোকচিত্রী ড্যানিয়েল তোরোকের তোলা একটি সরকারি ছবির অনুপ্রেরণায়।
মুদ্রার সামনের পিঠে রয়েছে ট্রাম্পের প্রতিকৃতি, সাথে লেখা ‘লিবার্টি’, ‘ইন গড উই ট্রাস্ট’ এবং ‘১৭৭৬-২০২৬’ সাল দুটি। পেছনের পিঠে রয়েছে প্রেসিডেনশিয়াল সিল- ঈগলের বুকে খোদাই করা ‘২৫০’ সংখ্যাটি, এক নখরে জলপাই শাখা ও অন্য নখরে তীর ধরে রাখা ঈগল, এবং ঠোঁটে ধরা ফিতায় লাতিন প্রবাদ ‘ই প্লুরিবাস উনুম’ (বহু থেকে এক)। মুদ্রায় আরও লেখা আছে ‘ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা’ ও ‘ওয়ান ডলার’।
উল্লেখ্য, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র স্বাক্ষরের ২৫০তম বার্ষিকী স্মরণে তৈরি এই মুদ্রার রং সোনালি হলেও এতে প্রকৃত স্বর্ণ নেই। মুদ্রাটি মূলত তামা দিয়ে তৈরি, বাকি অংশে রয়েছে দস্তা, ম্যাঙ্গানিজ ও নিকেল।
গত ৪ জুলাই বিশেষ ‘জুলাই ফোর্থ’ প্রিভি চিহ্নসহ আড়াই লাখ মুদ্রা তৈরি করা হয়, যা মিন্টের অনলাইন ক্যাটালগ থেকে কেনা ব্যাগ ও রোলের মধ্যে এলোমেলোভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিক্রি শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইউএস মিন্টের ওয়েবসাইটে মুদ্রার মজুদ শেষ হয়ে যায়। প্রতিটির অভিহিত মূল্য ১ ডলার হলেও সংগ্রাহকদের বেশি দাম গুনতে হচ্ছে- ২৫টি মুদ্রার একটি রোল বিক্রি হচ্ছে ৬১ ডলারে (প্রায় ২.৪৪ ডলার প্রতিটি) এবং ১০০টি মুদ্রার একটি ব্যাগের দাম ১৫৪.৫০ ডলার (প্রায় ১.৫৫ ডলার প্রতিটি)।
ওয়াশিংটন ডিসিতে মিন্টের দোকানে থাকা ভেন্ডিং মেশিনেও এগুলো পাওয়া যাচ্ছে, এবং এগুলোর দাম অভিহিত মূল্যের চেয়ে প্রায় ৫০ থেকে ১৫০ শতাংশ বেশি রাখা হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এক বিবৃতিতে বলেন, মুদ্রাটি স্বাধীনতার চিরন্তন উত্তরাধিকার ও দেশপ্রেমের প্রতীক হিসেবে তৈরি করা হয়েছে, যা আমেরিকান মূল্যবোধের শক্তি এবং সবার জন্য স্বাধীনতা রক্ষার প্রতিশ্রুতিকে তুলে ধরে।
আইনি জটিলতা ও ব্যতিক্রম
মুদ্রায় জীবিত প্রেসিডেন্টের ছবি ব্যবহার নিয়ে শুরু থেকেই সমালোচনা হয়েছে। ২০২০ সালের ‘সার্কুলেটিং কালেক্টেবল কয়েন রিডিজাইন অ্যাক্ট’ অনুযায়ী, ২৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে ইস্যু করা মুদ্রার পেছনের পিঠে (রিভার্স) কোনো ব্যক্তির হাফ-বাস্ট প্রতিকৃতি বা জীবিত ব্যক্তির প্রতিকৃতি রাখা নিষিদ্ধ।
তবে এই বিধিনিষেধ মুদ্রার সামনের পিঠের (অবভার্স) ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়- আর ট্রাম্পের ছবি বসানো হয়েছে ঠিক সামনের পিঠেই, ফলে আইনগতভাবে এটি বৈধ।
মূল নকশাটি চলতি বছরের শুরুতে অনুমোদন করে ইউএস কমিশন অব ফাইন আর্টস, যার সদস্যদের নিয়োগ দিয়েছিলেন ট্রাম্প নিজেই।
তবে বুধবার উন্মোচিত চূড়ান্ত মুদ্রাটি সেই অনুমোদিত নকশা থেকে কিছুটা ভিন্ন- যেমন এতে সোনার বদলে শুধু সোনালি প্রলেপ ব্যবহার করা হয়েছে, এবং প্রাথমিক নকশায় ডেস্কের ওপর হাত রেখে সামনে ঝুঁকে থাকা ভঙ্গি বাদ দেওয়া হয়েছে। এসব পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট কারণ ট্রেজারি বিভাগ জানায়নি।
মার্কিন কাগুজে নোটের ক্ষেত্রে অবশ্য নিয়ম আলাদা ও আরও কড়া। ১৮৬৬ সালের ‘থেয়ার সংশোধনী’ অনুযায়ী কাগুজে নোটে কোনো জীবিত ব্যক্তির প্রতিকৃতি ছাপানো সরাসরি নিষিদ্ধ- আর এই বিধান ঐতিহ্যগতভাবে ধাতব মুদ্রার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বলেই ট্রাম্পের প্রতিকৃতি মুদ্রায় সংযোজন সম্ভব হয়েছে।
তা সত্ত্বেও চলতি বছরের মে মাসে অর্থমন্ত্রী বেসেন্ট জানিয়েছিলেন, তার বিভাগ ট্রাম্পের প্রতিকৃতিসহ নতুন ২৫০ ডলারের একটি নোট চালুর পরিকল্পনা করছে। কংগ্রেসে ট্রাম্পের সহযোগীরা কাগুজে নোটের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে একটি আইনি প্রস্তাবও উত্থাপন করেছিলেন, যদিও তা এখনো স্থগিত অবস্থায় রয়েছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
আমেরিকার ইতিহাসে এর আগে একবারই কোনো ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের প্রতিকৃতি প্রচলিত মুদ্রায় স্থান পেয়েছিল। ১৯২৬ সালে দেশটির ১৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত একটি অর্ধ-ডলার মুদ্রায় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ক্যালভিন কুলিজের পাশাপাশি জর্জ ওয়াশিংটনের প্রতিকৃতিও ব্যবহার করা হয়েছিল।
ইউএস মিন্টের তথ্যমতে, সেটিই ছিল কোনো ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের প্রতিকৃতি ব্যবহারের একমাত্র আগের নজির।


