পরিবার, প্রকৃত বন্ধুত্ব, ধর্মীয় বিশ্বাস বা জীবনদর্শন এবং অর্থপূর্ণ কাজ—সুখী জীবনের জন্য এই চারটি বিষয়কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন সমাজবিজ্ঞানী ও সুখবিষয়ক গবেষক আর্থার ব্রুকস। তার মতে, বড় পদ, বিপুল সম্পদ কিংবা বিলাসবহুল জীবন স্থায়ী সুখের নিশ্চয়তা দেয় না। বরং আনন্দ, তৃপ্তি ও জীবনের অর্থবোধের সমন্বয়েই গড়ে ওঠে সুখের ভিত্তি।
হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের সাবেক এই অধ্যাপক প্রায় ৩০ বছর ধরে সুখ নিয়ে গবেষণা করছেন। সিইও, বিলিয়নেয়ার ও বিভিন্ন পেশার সফল মানুষের সাথে কাজ করে তিনি দেখেছেন, পেশাগত সাফল্য থাকলেও অনেকে নিঃসঙ্গতা, উদ্বেগ ও অতৃপ্তিতে ভোগেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সুখের উপাদান, প্রযুক্তির প্রভাব, কাজের চাপ এবং অর্থ ব্যয়ের অভ্যাস নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন তিনি।
ব্রুকসের মতে, সুখের তিনটি প্রধান উপাদান হলো আনন্দ, তৃপ্তি ও জীবনের অর্থবোধ। দৈনন্দিন জীবনে আনন্দ খুঁজে পাওয়া, অর্জনে তৃপ্ত হওয়া এবং নিজের কাজ ও অস্তিত্বের অর্থ উপলব্ধি করা—এই তিনটির সমন্বয়েই সুখের ভিত্তি তৈরি হয়।
সুখের জন্য চারটি অভ্যাস
ব্রুকসের ব্যাখ্যায়, মানুষের সুখের পার্থক্যের প্রায় ৫০ শতাংশের সাথে জিনগত বৈশিষ্ট্যের সম্পর্ক রয়েছে। পরিস্থিতির প্রভাব প্রায় ২৫ শতাংশ, আর বাকি ২৫ শতাংশ নির্ভর করে অভ্যাসের ওপর। জিন কিংবা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলেও অভ্যাস বদলে সুখ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
তিনি চারটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেন—ধর্মীয় বিশ্বাস বা জীবনদর্শন, পরিবারের সাথে সুসম্পর্ক, প্রকৃত বন্ধুত্ব এবং অর্থপূর্ণ কাজ। তার মতে, পেশা যা-ই হোক, নিজের কাজের মাধ্যমে অন্যের উপকার করা এবং মূল্য তৈরি করার অনুভূতি মানুষের জীবনে তৃপ্তি আনে।
ব্রুকস জানান, সুখ নিয়ে পড়ানো এবং অন্যদের সুখী হতে সাহায্য করার কাজে যুক্ত হওয়ার পর তার নিজের সুখের মাত্রা প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে।
অতিরিক্ত কাজ সুখ কেড়ে নেয়
সব সময় পেশাগত সাফল্যের পেছনে ছোটা মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে মনে করেন ব্রুকস। অতিরিক্ত কাজের চাপে দাম্পত্য সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়, সন্তানদের সাথে সময় কাটানো কমে এবং অর্জন করেও অনেকে তৃপ্তি পান না।
তার মতে, দীর্ঘ সময় অফিসে থাকলেই উৎপাদনশীলতা বাড়ে না। অতিরিক্ত ক্লান্তিতে কাজের দক্ষতা কমতে পারে। তাই সময় পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করে পরিবার ও বন্ধুদের জন্য সময় রাখা জরুরি।
ব্রুকসের মতে, জীবনের শেষ সময়ে মানুষ কত বড় পদে ছিলেন, তার চেয়ে প্রিয়জনদের সাথে কেমন সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পেশাগত যোগাযোগের পাশাপাশি এমন বন্ধুত্ব প্রয়োজন, যেখানে কোনো ব্যবসায়িক সুবিধা নয়, বরং আন্তরিকতাই সম্পর্কের ভিত্তি।
বড় পদেও থাকে নিঃসঙ্গতা
নিজে ১১ বছর সিইও হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ব্রুকস বলেন, প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে পৌঁছালেই মানুষ সুখী হয়ে ওঠে না। বরং নেতৃত্বের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে নিঃসঙ্গতা ও রাগ দেখা দিতে পারে।
উচ্চপদে গেলে পুরোনো সম্পর্ক বদলে যায়। কর্মীদের সাথে দূরত্ব তৈরি হতে পারে, আবার নিজের ও অন্যের জীবন নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার হতাশাও বাড়ে। এ অবস্থা সামলাতে কাজের বাইরের বন্ধুত্ব বজায় রাখা, জীবনসঙ্গীকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া এবং সমপর্যায়ের মানুষের সাথে অভিজ্ঞতা ভাগাভাগির পরামর্শ দেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ
ব্রুকস মনে করেন, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার বাস্তব সম্পর্কের জায়গা দখল করে নিতে পারে। এতে নিঃসঙ্গতা, উদ্বেগ ও বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। অনলাইনে যোগাযোগ বাস্তব সম্পর্কের পুরোপুরি বিকল্প নয় বলেও সতর্ক করেন তিনি।
তার পরামর্শ, দিনের প্রথম ও শেষ এক ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এড়িয়ে চলা এবং সব প্ল্যাটফর্ম মিলিয়ে দিনে সর্বোচ্চ ৬০ মিনিট ব্যবহারের লক্ষ্য রাখা। যেসব অ্যাকাউন্ট থেকে শেখা যায়, প্রকৃত বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ রাখা যায় কিংবা স্বাস্থ্যকর বিনোদন পাওয়া যায়, সেগুলোতেই সীমাবদ্ধ থাকা ভালো।
শিশুদের প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সতর্কতার কথা বলেছেন ব্রুকস। তার মতে, এআই দৈনন্দিন কাজ সহজ করতে পারে, কিন্তু বন্ধুত্ব, ভালোবাসা কিংবা গভীর মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রে বাস্তব মানুষের বিকল্প হওয়া উচিত নয়। প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহায়তা করবে, বাস্তব সম্পর্ক থেকে দূরে সরিয়ে নেবে না।
সকাল শুরু হোক ভালো অভ্যাসে
সুখ ও কর্মদক্ষতা বাড়াতে দিনের শুরুতে প্রযুক্তি থেকে দূরে থেকে ব্যায়াম, প্রার্থনা, ধ্যান কিংবা পড়াশোনায় সময় দেওয়ার পরামর্শ দেন ব্রুকস। তার নিজের রুটিনে রয়েছে ভোরে ঘুম থেকে ওঠা, ব্যায়াম, প্রার্থনা ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ। তবে সবার জীবনযাত্রা এক নয়; নিজের পরিস্থিতির সাথে মিলিয়ে নিয়মিত অভ্যাস গড়ে তোলাই গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যাপ্ত ঘুম, ব্যায়াম এবং মানসিক চাপ কমানোর চর্চা নেতিবাচক অনুভূতি সামলাতে সাহায্য করতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।
টাকা খরচেও চাই সচেতনতা
ব্রুকসের মতে, দামি গাড়ি, বাড়ি কিংবা বিলাসবহুল পণ্য স্থায়ী সুখ নিশ্চিত করে না। তবে অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় করলে জীবনে তৃপ্তি বাড়তে পারে। এ জন্য তিনি পাঁচটি খাতের কথা বলেন—প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা, অর্থবহ অভিজ্ঞতা অর্জন, অর্থের বিনিময়ে কিছু কাজ করিয়ে নিজের সময় বাঁচানো, দান করা এবং ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়।
তার মতে, প্রিয়জনদের সাথে অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি, নিজের উন্নতির জন্য সময় বের করা এবং অর্থপূর্ণ কাজে সহায়তা জীবনকে সমৃদ্ধ করতে পারে। কত টাকা খরচ হচ্ছে, তার চেয়ে কোন কাজে ব্যয় হচ্ছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণের পাশাপাশি ফলাফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ব্রুকস। তার মতে, শুধু সুখী হওয়ার কথা ভাবলেই সুখ আসে না; বরং আনন্দ, তৃপ্তি ও অর্থবোধ বাড়ায়—এমন অভ্যাস গড়ে তুলতে হয়।

