নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় বাস্তবে নির্মাণকাজ অসম্পূর্ণ থাকা সত্ত্বেও প্রাথমিক শিক্ষা অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যারে শতভাগ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ঠিকাদারের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিল উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। এতে সংশ্লিষ্ট তদারকি কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনেছেন স্থানীয়রা।
উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ডিমলা উপজেলার রামডাঙ্গা মাঝিপাড়া ও মধ্য ছাতনাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর ও ফটক নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করা হয়। ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার ‘এইচএস এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ২৬ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৯ টাকা চুক্তিমূল্যে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী ২০২৩ সালের ৮ আগস্টের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল।
অভিযোগ উঠেছে, ওই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই রামডাঙ্গা মাঝিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই PEIMS সফটওয়্যারে শতভাগ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে পুরো চূড়ান্ত বিল উত্তোলন করে নেওয়া হয়।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নথিপত্রে কাজ শেষ দেখানো হলেও বাস্তবে সীমানা প্রাচীরের ওপর নির্ধারিত লোহার গ্রিল, মূল স্টিলের গেট, স্কুলের নাম সংবলিত সাইনেজ এবং প্রাচীরের একাংশের নির্মাণকাজ বাকি রয়ে গেছে। পুরো প্রাচীরে রং না করায় ইতিমধ্যেই জমেছে শ্যাওলা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজে নিম্নমানের রড, তিন নম্বর ভাঙাচোরা ইট, ইটের নিম্নমানের খোয়া এবং নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে। সেই সাথে সঠিক নিয়ম মেনে কিউরিং না করায় প্রাচীরের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক প্রফুল্ল কুমার চক্রবর্তী বলেন, ‘কাজ শেষ করার জন্য ঠিকাদারকে বারবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও কাজ শেষ করা হয়নি। আমরা বিদ্যালয় থেকে কোনো কাজ সমাপ্তির প্রত্যয়নপত্র বা রিপোর্ট দিইনি। অথচ আমাদের অজান্তেই কীভাবে চূড়ান্ত বিল তোলা হলো, তা আমাদের বোধগম্য নয়।’
বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ১৮৭ জন শিক্ষার্থী ও পাঁচজন শিক্ষক রয়েছেন। মূল ফটক ও প্রাচীর অসম্পূর্ণ থাকায় প্রতিদিন বিদ্যালয়ে অবাধে গবাদিপশু প্রবেশ করছে। এতে নোংরা হচ্ছে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ, আর ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা।
প্রকল্পের সময় দায়িত্বে থাকা তৎকালীন উপজেলা প্রকৌশলী শফিউর রহমান (বর্তমানে এলপিআর-এ) এবং সার্ভেয়ার শাকিল হোসেনের বিরুদ্ধে এই ভুয়া তথ্য আপলোডের অভিযোগ রয়েছে।
তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে সাবেক উপজেলা প্রকৌশলী শফিউর রহমানের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।
তিনি বলেন, ‘আমি তখন অসুস্থ ছিলাম এবং ২০২৩ সালে চিকিৎসার জন্য ভারতে ছিলাম। আসলে মাঠপর্যায়ের এসব বিষয় সহকারী প্রকৌশলী তদারকি করেন। তখন কথা ছিল ঠিকাদারের যে জামানতের টাকা রয়েছে, তা দিয়ে অসম্পূর্ণ কাজগুলো করিয়ে নেওয়া হবে।’
২০২৩ সালে বিল উঠলেও এখনও পর্যন্ত কাজ শেষ হয়নি কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি ক্ষোভ ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, সেই সময়ে যারা কাজটি সাব-ঠিকাদার হিসেবে নিয়েছিল, প্রভাবের কারণে তাদের সাথে কোনোভাবেই পেরে ওঠা যেত না। আর বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাদের সাথে পারা আরও অনেক কঠিন বিষয়। তবে যেহেতু ঠিকাদারের জামানতের টাকা এখনো অফিসে গচ্ছিত রয়েছে, তাই অন্য কাউকে দিয়ে কাজটি শেষ করিয়ে নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত সার্ভেয়ার শাকিল হোসেন নিজের ভুল স্বীকার করে বলেন, ‘বিষয়টি আমি না বুঝেই ভুল করেছি। আমার অন্যায় হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে বাকি কাজ সম্পন্নের ব্যবস্থা করছি।’
তবে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এইচএস এন্টারপ্রাইজের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


