প্রতিষ্ঠার প্রায় সাত দশক পেরিয়ে গেলেও পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ছাত্র-শিক্ষক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র (টিএসসিসি)। ২০১৬ সালে বর্তমান ভবনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলেও পর্যাপ্ত কক্ষ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে সেখানে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রম গড়ে ওঠেনি।
দীর্ঘদিন রাকসু ভবনকেন্দ্রিক কার্যক্রম চালানো সংগঠনগুলোকে এখন জরাজীর্ণ পুরাতন শেখ রাসেল মডেল স্কুল ভবনে স্থানান্তর করা হয়েছে। ফলে একদিকে পূর্ণাঙ্গ টিএসসিসি নির্মাণের দাবি বাস্তবায়িত হয়নি, অন্যদিকে নতুন জায়গার পরিবেশ ও অবকাঠামো নিয়েও সংকটে পড়েছে সংগঠনগুলো।
রাকসু নির্বাচনের পর সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে রাকসু ভবন থেকে সরিয়ে পুরাতন শেখ রাসেল মডেল স্কুল ভবনে জায়গা দেওয়া হয়। তবে দীর্ঘদিন সংস্কারহীন ভবনটিতে পর্যাপ্ত জায়গা, আলো-বাতাস, সুপেয় পানি ও পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা না থাকায় স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছেন সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, পুরাতন শেখ রাসেল মডেল স্কুল ভবনের কক্ষগুলো ছোট, অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে। অনেক জানালা ভাঙা এবং টিনের চালা নাজুক হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে। জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে ওয়াশরুমগুলোও। নেই পর্যাপ্ত সুপেয় পানির ব্যবস্থা। সীমিত ইন্টারনেট সংযোগের পাশাপাশি আলো নিয়েও রয়েছে সমস্যা।
বৃষ্টির সময় টিনের চালা দিয়ে পানি পড়ায় ভবনের ভেতরে আর্দ্রতা বেড়ে যায়। এতে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর বাদ্যযন্ত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জায়গা সংকীর্ণ হওয়ায় নাটক, সংগীতচর্চা ও নিয়মিত মহড়াও ব্যাহত হচ্ছে।
বর্তমানে ভবনটিতে প্রায় ১৫টি সাংস্কৃতিক সংগঠন সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে সাংস্কৃতিক জোটের আওতাধীন আটটি সংগঠন কক্ষ বরাদ্দ পেয়েছে। এগুলো হলো-রাজশাহী ইউনিভার্সিটি ড্রামা অ্যাসোসিয়েশন, সমকাল নাট্যচক্র, অ্যাসোসিয়েশন ফর কালচার অ্যান্ড এডুকেশন, বাংলাদেশ গণশিল্পী সংস্থা, তীর্থক নাটক, স্বনন, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী ও বিশ্ববিদ্যালয় থিয়েটার রাজশাহী।
এ ছাড়া শিবিরের বিকল্প সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংসদ, ছাত্রদলের জাসস, অরণি সাংস্কৃতিক সংসদ ও অনুশীলন নাট্যদলসহ কয়েকটি সংগঠনও সেখানে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
রাবি কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি নাসিম আহমেদ বলেন, ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সুযোগ-সুবিধা দিন দিন কমছে। বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রতিনিধিত্ব করা সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর জন্য এমন পরিবেশ অত্যন্ত দুঃখজনক।
তিনি বলেন, বৃষ্টির সময় ভবনের টিন দিয়ে পানি ঢুকে অতিরিক্ত আর্দ্রতা তৈরি হয়। এতে বাদ্যযন্ত্র নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ছোট কক্ষের কারণে পর্যাপ্ত রিহার্সেলও করা সম্ভব হয় না। পর্যাপ্ত ওয়াশরুম ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই। লাইটের সমস্যাও নিয়মিত দেখা যায়। এসব বিষয়ে বারবার জানানো হলেও কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি।
রাবি কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক রিফাইয়া রাজ্জাক রিফা বলেন, টিএসসিসিতে কার্যালয় হওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘদিন সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো রাকসু ভবনে কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। রাকসু নির্বাচনের পর তাদের পুরাতন শেখ রাসেল মডেল স্কুলে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে রাকসু ভবনের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ জায়গাও নেই। ফলে নাটকসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনায় নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, “এখানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, আলো ও খাবার পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। সন্ধ্যার পর নারী সদস্যদের জন্যও জায়গাটি অস্বস্তিকর। পাশাপাশি সাপের ভয়ও রয়েছে। সংস্কারের জন্য আবেদন করে উপাচার্যের অনুমোদন পাওয়া গেলেও এখনো কাজ শুরু হয়নি।”
মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সুখরঞ্জন সমাদ্দারের নামে এই টিএসসির নামকরণ করা হয়েছে। ১৯৮৪ সালে ১ হাজার ৯৮২ বর্গফুট জায়গায় টিএসসির ভবন নির্মাণের অনুমতি পায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে মাত্র ৪০০ বর্গফুট জায়গা নিয়ে ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু হয়।
দীর্ঘ নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে নির্মাণকাজ শুরুর প্রায় দুই যুগ পর ২০১৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর বর্তমান টিএসসির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। কিন্তু ভবনটি চালু হলেও প্রয়োজনীয় কক্ষ ও অবকাঠামো না থাকায় সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর প্রত্যাশিত কার্যক্রম সেখানে গড়ে ওঠেনি। ফলে সংগঠনগুলোর কার্যক্রম দীর্ঘদিন রাকসু ভবনকেন্দ্রিকই থেকে যায়।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে প্রায় সাড়ে তিন দশক পর গত বছরের ১৬ অক্টোবর সপ্তদশবারের মতো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ১২টি প্যানেলের মধ্যে ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ কেন্দ্রীয় সংসদের ২৩টি পদের মধ্যে ভিপি, এজিএসসহ ২০টিতে জয়লাভ করে।
নির্বাচনের আগে এক বছরের মধ্যে ২৪টি সংস্কার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল প্যানেলটি। এর মধ্যে অন্যতম ছিল পূর্ণাঙ্গ টিএসসিসি নির্মাণ। কিন্তু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রায় ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।
রাকসুর সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক জায়িদ হাসান জোহা বলেন, শুরু থেকেই পুরাতন শেখ রাসেল মডেল স্কুল ভবন সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা একাধিকবার রাকসুর অধিবেশন ও প্রশাসনের কাছে তুলে ধরেছি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এটি অন্তর্ভুক্ত করার আশ্বাস দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাজেটে রাখা হয়নি।
তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ টিএসসিসি নির্মাণ একটি বড় প্রকল্প। পুরাতন শেখ রাসেল মডেল স্কুল সংস্কারের তুলনায় এতে কয়েক গুণ বেশি অর্থের প্রয়োজন। নতুন কয়েকটি হল নির্মাণের জন্য যে বাজেট আসছে, তার সঙ্গে টিএসসিসির বাজেটও অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
জায়িদ হাসান জোহা আরও বলেন, বর্তমান টিএসসিসি ভবনে জায়গার সংকট থাকায় এটি সম্প্রসারণের সুযোগও নেই। পূর্ণাঙ্গ আবাসিকতার মতো টিএসসিসি নির্মাণের ক্ষেত্রেও একটি রোডম্যাপ নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে প্রশাসনের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না।
পূর্ণাঙ্গ টিএসসিসি নির্মাণ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে যে টিএসসি ভবনটি আছে, সেটিকে আমি উপযোগী ভবন বলে মনে করি না। এর এক্সটেনশন প্রয়োজন এবং এটিকে ঘিরে আরও বিল্ডিং ও অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন রয়েছে। ভিতরের হলরুমটিও রেনোভেশন করা দরকার। সেখানে ভালো সাউন্ড সিস্টেম নেই, এসির ব্যবস্থাও নেই। এসব বিষয় নিয়ে আমরা ডিপিপি নিয়েছি।
তিনি আরও বলেন, আরও ভবন নির্মাণের সুযোগ থাকলে, সেটিকে ঘিরেই ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বা ডিসপ্লেসড অবস্থায় থাকা বিভিন্ন সংগঠনকে এক জায়গায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে ডিপিপি নেওয়ার কথা জানানো হলেও পূর্ণাঙ্গ টিএসসিসি নির্মাণের নির্দিষ্ট সময়সীমা বা বাস্তবায়নের দৃশ্যমান উদ্যোগ এখনো সামনে আসেনি। ফলে প্রায় সাত দশক ধরে চলে আসা সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর পূর্ণাঙ্গ টিএসসিসির প্রত্যাশা কবে বাস্তব রূপ পাবে, তা এখনো অনিশ্চিত।



