বান্দরবানের লামা উপজেলার দুর্গম সাঙ্গু মৌজায় প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে না ম্রো সম্প্রদায়ের শতাধিক শিশু। নিকটবর্তী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৭ থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় পাহাড়ি পথ পেরিয়ে নিয়মিত স্কুলে যাওয়া তাদের জন্য কঠিন। ফলে রোয়াজাপাড়া, রেংলেপাড়াসহ অন্তত পাঁচটি ম্রোপাড়ার অনেক শিশু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে এলাকায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাঙ্গু মৌজায় রোয়াজাপাড়া, রেংলেপাড়াসহ আশপাশের কয়েকটি পাড়ায় দীর্ঘদিন ধরে ম্রো জনগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করছেন। এসব পাড়ার শিশুদের জন্য কাছাকাছি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় তাদের শিক্ষাজীবনের শুরুতেই বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নিকটবর্তী সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে যেতে শিশুদের ৭ থেকে ৮ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হয়। পথে রয়েছে পাহাড়ি ছড়া, নদী এবং উঁচু-নিচু দুর্গম রাস্তা। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে ছড়ার পানি বেড়ে যাওয়া, তীব্র স্রোত ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে শিশুদের পক্ষে বিদ্যালয়ে যাতায়াত আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় অনেক শিশু বর্ণমালাও শিখতে পারছে না। বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাদের কেউ কেউ পরিবারের জীবিকা নির্বাহে জুমচাষসহ বিভিন্ন কাজে যুক্ত হচ্ছে। এতে শৈশবেই শিক্ষার স্বাভাবিক সুযোগ থেকে পিছিয়ে পড়ছে তারা।
এলাকায় শিক্ষার সুযোগ তৈরিতে কিছু ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত নয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের তথ্য অনুযায়ী, রোয়াজাপাড়ায় সিংমং নামে এক ব্যক্তি ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেখানে দুজন শিক্ষক ৩০ থেকে ৪০ জন শিক্ষার্থীকে পাঠদান করছেন। এ ছাড়া ২০১৮ সালে আলীকদম জোনের সহায়তায় গয়ালমারা গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মৈত্রী স্কুল’। তবে এসব উদ্যোগের পরও রোয়াজাপাড়া, রেংলেপাড়াসহ আশপাশের পাঁচটি ম্রোপাড়ার সব শিশুর জন্য সহজলভ্য শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়নি।
সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় অভিভাবকেরা। তাদের ভাষ্য, অন্যান্য এলাকার শিশুরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে গিয়ে পড়াশোনা করছে। অথচ দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে তাদের সন্তানদের অনেকেই বর্ণমালা শেখার সুযোগ পাচ্ছে না। এ অবস্থায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে এলাকায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন তারা।
সাঙ্গু মৌজায় বিদ্যালয় স্থাপনের যৌক্তিকতার বিষয়টি উঠে এসেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন-৩ শাখার একটি প্রতিবেদনেও। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য চাহিদাভিত্তিক নতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের বিষয়ে মতামত চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের রোয়াজাপাড়া রেংলেপাড়া, মেনক্রুংপাড়া, রেংছমপাড়া ও মাংখাইকপাড়ার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। সেখানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা রয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জমির সংস্থানও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাঙ্গু মৌজার হেডম্যান চংপাত ম্রো বলেন, সাঙ্গু মৌজার রোয়াজাপাড়ায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে আমি প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের কাছে সুপারিশ ও প্রত্যয়ন দিয়েছি। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো কার্যকর অগ্রগতি দেখতে পাইনি।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাবে সাঙ্গু মৌজার ম্রো জনগোষ্ঠীর শিশুরা শিক্ষার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে। তাদের জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে সরকারি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বিকল্প শিক্ষা কার্যক্রম চালুর বিষয়টিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
শিক্ষা প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার। তাই রোয়াজাপাড়া, রেংলেপাড়াসহ সাঙ্গু মৌজার আশপাশের পাড়াগুলোর শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ চান স্থানীয় বাসিন্দারা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে দুর্গম পাহাড়ি জনপদের শিশুদের জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করবে-এমন প্রত্যাশা তাদের।


