চারদিকে যখন দুর্গোৎসবের আনন্দ, নতুন পোশাকে সেজে মানুষ ছুটছেন মণ্ডপে মণ্ডপে, তখনও ফুটপাতের এক কোণে বসে জুতা সেলাই ও পালিশ করে চলেছেন কালিপদ। তারও হয়তো ইচ্ছে করে নতুন পোশাক পরে পরিবারের সাথে পূজার আনন্দ ভাগ করে নিতে। কিন্তু সেই ইচ্ছাগুলো চাপা পড়ে যায় সংসারের খরচ আর অসুস্থতার দুশ্চিন্তায়। ডেঙ্গুতে নিজের চিকিৎসা করাতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়েছেন তিনি। এখন সেই ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েই প্রতিদিন বসেন ফুটপাতে যদি কিছু বাড়তি আয় হয়, যদি একটু স্বস্তি ফেরে জীবনে। অন্যের জুতা মেরামত করতে করতে কালিপদ হয়তো ভুলে থাকার চেষ্টা করেন নিজের জীবনের ক্ষতগুলো। অথচ তাঁরও তো স্বপ্ন ছিল, তারও তো উৎসব করার কথা ছিল!
জুতা সেলাইয়ের কারিগর কালিপদ বলেন, প্রায় দেড় মাস ধরে তিনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। ক্লিনিকে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা করাতে গিয়ে প্রায় ৫০ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে তাঁর। সংসারে চারজন সদস্য। তাঁদের খাওয়া-দাওয়ার খরচও চালাতে হয় তাঁকে। অসুস্থ শরীর নিয়ে এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। বেশি সময় কাজ করার মতো শারীরিক সক্ষমতাও নেই। তবু সংসারের কথা ভেবে ফুটপাতে বসতে হচ্ছে তাকে।
কালিপদ বলেন, “ডেঙ্গুর চিকিৎসা করাতে গিয়ে প্রায় ৫০ হাজার টাকা ঋণ হয়ে গেছে। ছেলে-মেয়ে আর স্ত্রীর জন্য পূজায় কিছুই কিনতে পারিনি। শরীর এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি, বেশিক্ষণ বসেও থাকতে পারি না। কিন্তু বসে থাকলে তো না খেয়ে মরতে হবে। এক বেলা কাজ করে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা আয় হয়। সেই টাকা দিয়েই কোনোরকমে চাল-ডাল কিনে সংসার চালাচ্ছি।”
খুলনার পিকচার প্যালেস মোড়ের পাশেই শহরের অন্যতম ধর্মসভা মন্দির। মন্দির ঘিরে যখন উৎসবের আমেজ, তখন ঠিক পাশের ফুটপাতেই জীবনের কঠিন হিসাব মেলাতে ব্যস্ত কালিপদ। তাঁর মতো আরও অনেক মানুষ রয়েছেন, যাঁরা উৎসবের দিনেও জীবিকার তাগিদে বসে আছেন ফুটপাতের ছোট্ট জায়গাটুকুতে। নগরীর বিভিন্ন স্থানে জুতা সেলাই ও পালিশের কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন তারা। কারও জীবনে অসুস্থতার চিকিৎসাব্যয়, কারও কাঁধে ঋণের বোঝা, আবার কারও প্রতিদিনের লড়াই দুমুঠো খাবার জোগাড়ের। অন্যরা যখন পূজার আনন্দে মেতে উঠেছেন, তখন তাঁদের কাছে প্রতিটি ক্রেতাই একটু বাড়তি আয়ের আশা। এভাবেই উৎসবের আনন্দের আড়ালে নীরবে বয়ে চলে তাঁদের জীবনসংগ্রাম, যেখানে নিজের ইচ্ছার চেয়ে পরিবারের প্রয়োজনই বড়, আর আনন্দের চেয়ে বেঁচে থাকার তাগিদটাই প্রবল।
জুতা সেলাইয়ের কারিগর বিনোদ বলেন, কাজকর্ম তেমন নেই। এর মধ্যে তাঁর ছেলে-মেয়ে দুজনই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল। ধারদেনা করে তাদের চিকিৎসা করিয়ে বাড়িতে ফিরিয়ে এনেছেন। এখন ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে সংসার চালাতেই হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। এমন পরিস্থিতিতে পূজা উপলক্ষে ছেলে-মেয়ের জন্য নতুন পোশাক কেনা তো দূরের কথা, সংসারের প্রয়োজনীয় বাজার করাও কঠিন হয়ে পড়েছে তাঁর জন্য।
জুতা সেলাইয়ের কারিগর কালিদাশ বলেন, এ বছর জ্বর-জারি আর ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি। অসুস্থতা আর কাজকর্মের টানাপোড়েনে সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাই পূজা উপলক্ষে নিজের কিংবা পরিবারের কারও জন্য নতুন জামাকাপড় কেনা সম্ভব হয়নি। জীবিকার তাগিদে উৎসবের দিনেও কাজ করে যেতে হচ্ছে তাঁকে। আক্ষেপের সুরে কালিদাশ বলেন, “কাজকাম করে খাতি হচ্ছে। আমাগে আর পুজো!”
কালিপদদের যে হাতে অন্যের ছেঁড়া জুতা জোড়া লাগে, সেই হাতেই যেন প্রতিদিন সেলাই হয় তাঁদের ভেঙে পড়া স্বপ্নগুলোও। তবু কোনো অভিযোগ নেই, থেমে থাকার সুযোগও নেই। কারণ, তাঁদের কষ্টে থেমে থাকে না সংসার, তাঁদের অসুস্থতায় থেমে থাকে না জীবনের হিসাব। সবার পূজা মণ্ডপে, আর কালিপদদের পূজা ফুটপাতে—অন্যের উৎসবের আনন্দের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের পরিবারের মুখে একটু হাসি ফোটানোর নিরন্তর প্রার্থনায়।

