চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগরে শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত মো. ইয়াসিনের নামে থাকা ২৭৫ শতক জমির ৭৪টি বিক্রয় দলিল রেজিস্ট্রি করে দিয়েছেন সীতাকুণ্ডের সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীব। ইয়াসিনের গোপন আস্তানায় গিয়ে দুই দফায় এসব দলিল নিবন্ধন করা হয়। এর মধ্যে গত ১৭ সেপ্টেম্বর এক দিনেই ৬৫টি এবং ১ অক্টোবর আরও নয়টি দলিল রেজিস্ট্রি করা হয়।
ইয়াসিন র্যাবের (বর্তমানে এসআরবি) কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া হত্যা মামলার প্রধান আসামি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে হত্যা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ ২১টি মামলা রয়েছে। পুলিশের খাতায় তিনি পলাতক।
সাব-রেজিস্ট্রার অফিস ও জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, কমিশনের মাধ্যমে এসব দলিল রেজিস্ট্রির জন্য কাগজপত্রসহ আবেদন করেন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন। পরে সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীব ও তার সহযোগীরা ইয়াসিনের আস্তানায় গিয়ে দলিল নিবন্ধন করেন। পুরো কার্যক্রম সম্পন্ন হয় সন্ধ্যার পর।
গত ২৬ অক্টোবর রায়হান হাবীবসহ দেশের ৮৫ জন সাব-রেজিস্ট্রারকে একযোগে বদলি করা হয়। বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের ২৯ অক্টোবরের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে বলা হয়েছিল। তবে ইয়াসিনের নামে ৬৫টি দলিল রেজিস্ট্রির বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা তার বিরুদ্ধে তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে মৌখিক অভিযোগ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে রায়হানের বদলির আদেশ সাত দিনের জন্য স্থগিত করা হয়। এর মধ্যেই ১ অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় আরও নয়টি দলিল রেজিস্ট্রি করেন তিনি।
কমিশনে দলিল নিবন্ধনের নিয়ম
প্রচলিত রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮-এর ৩৮ ধারা অনুযায়ী, শারীরিক অক্ষমতা, কারাবাস, গুরুতর অসুস্থতা বা অন্য কোনো বৈধ কারণে কোনো ব্যক্তি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে উপস্থিত হতে না পারলে কমিশনের মাধ্যমে দলিল নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে নির্ধারিত ফি দিয়ে আবেদন করতে হয়। সাব-রেজিস্ট্রার আবেদন গ্রহণযোগ্য মনে করলে কোনো কর্মকর্তা বা কমিশনারকে দলিলদাতার বাড়ি, হাসপাতাল কিংবা নির্দিষ্ট স্থানে পাঠাতে পারেন। কমিশনারের উপস্থিতিতে দলিলদাতা দলিল বুঝে স্বাক্ষর বা টিপসই দেন এবং সাক্ষীরা সাক্ষ্য দেন। পরে কমিশনার প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ দলিলটি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমা দেন। এরপর আইন অনুযায়ী নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
তবে ইয়াসিনের জমির দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে এসব নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের মহাসচিব অ্যাডভোকেট জিয়া হাবিব আহসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কমিশনের মাধ্যমে একসাথে তিনটির বেশি দলিল রেজিস্ট্রির সুযোগ নেই। অথচ এক দিনেই ৬৫টি দলিল নিবন্ধন করা হয়েছে। কীভাবে এতগুলো দলিল রেজিস্ট্রি করা হলো এবং কোন নিয়মে অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।
জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরের নিয়ন্ত্রণ
চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সংযোগ সড়ক থেকে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের বিপরীত পাশের সড়ক ধরে পাহাড়ের ভেতরে গেলে জঙ্গল সলিমপুর এলাকা। এলাকাটি মূলত জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর—এই দুই অংশে বিভক্ত।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এখানে প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল। আলীনগর ছিল ইয়াসিন ও তার বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে।
গত ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্য যৌথ অভিযান চালিয়ে জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নেন। এর আগে বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালাতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা হামলার শিকার হয়েছিলেন। যৌথ অভিযানের পর সন্ত্রাসীরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। পরে জঙ্গল সলিমপুরের এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয় ও আলীনগর উচ্চবিদ্যালয়ে র্যাব ও পুলিশের সমন্বয়ে পৃথক দুটি চৌকি স্থাপন করা হয়।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ইয়াসিনের নামে রেজিস্ট্রি করা ৭৪টি দলিলে জমির মূল্য দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এসব জমির বর্তমান বাজারমূল্য ১০ কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ দলিলে দেখানো মূল্য ও স্থানীয়দের দেওয়া বাজারমূল্যের হিসাবে ব্যবধান ৭ কোটি ১৩ লাখ টাকার বেশি।
স্থানীয় বাসিন্দারা প্রশ্ন তুলেছেন, কয়েক বছর আগেও ঝুট মিলের শ্রমিক হিসেবে কাজ করা ইয়াসিন কীভাবে জঙ্গল সলিমপুরের বিপুল জমির মালিক হলেন। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, লিংক রোডের আশপাশে প্রতি শতক জমি ৯ থেকে ১০ লাখ টাকায় কেনাবেচা হচ্ছে। এ হিসাবে এলাকাটিতে বিপুল পরিমাণ ভূসম্পদ রয়েছে। সরকারি খাসজমির পাশাপাশি কিছু ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিও আছে।
দলিল নিবন্ধনে যারা যুক্ত ছিলেন
সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীবের সাথে দুই দফায় ইয়াসিনের আস্তানায় যান সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মচারী করিম, সিরাজউদ্দিন, তুষার ও রতন। দলিল নিবন্ধনের পুরো কার্যক্রমের তত্ত্বাবধানে ছিলেন রায়হান হাবীব।
সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মচারী সিরাজউদ্দিন ইয়াসিনের আস্তানায় গিয়ে দলিল নিবন্ধনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ভাটিয়ারি থেকে আধা কিলোমিটার ভেতরে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। জায়গাটি তার কাছে আস্তানা বলে মনে হয়েছিল। তবে ইয়াসিনকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না বলে জানান।
খাজনা পরিশোধ নিয়েও প্রশ্ন
দলিল নিবন্ধনের আগে গত ২৪ আগস্ট এসব জমির খাজনা পরিশোধ করেন ইয়াসিন। এতে উপজেলা ভূমি অফিসের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে সীতাকুণ্ড উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ফজলে রাব্বি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ইয়াসিনের নামে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি থাকলে মালিকানার অধিকার অনুযায়ী তিনি খাজনা দিতে পারেন। তবে জমির দলিল হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ভূমি অফিসের কোনো ভূমিকা নেই।
সবশেষ নয়টি দলিল নিবন্ধনের বিষয়ে জানতে সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীবের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে ২৮ অক্টোবর এক দিনে ৬৫টি দলিল নিবন্ধনের বিষয়ে জানতে চাইলে রায়হান হাবীব বলেছিলেন, সীতাকুণ্ড ভূমি অফিসের কাগজপত্র অনুযায়ী জমিগুলো ইয়াসিনের নামে নামজারি করা রয়েছে এবং তিনি খাজনাও দিয়েছেন। আইনজীবী নাজিম উদ্দিন কাগজপত্রসহ আবেদন করেছিলেন। কাগজপত্র ঠিক থাকায় দলিলগুলো নিবন্ধন করা হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানানো হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
জঙ্গল সলিমপুরের জমি নিয়ে প্রশাসনের তৎপরতার পরও কীভাবে দলিল নিবন্ধন করা হলো- এমন প্রশ্নে রায়হান হাবীব বলেন, তারা কাগজপত্র যাচাই করেন। জঙ্গল সলিমপুরের জমি নিয়ে তাদের বিশেষ কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। আইন অনুযায়ী সব প্রক্রিয়া মেনেই দলিল নিবন্ধন করা হয়েছে।
যা বলছে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ২৮ অক্টোবর বিকেলে বিষয়টি জানার পর তদন্ত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। সীতাকুণ্ডের ইউএনও সাব-রেজিস্ট্রারকে ডেকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। সাব-রেজিস্ট্রার জানিয়েছেন, ইয়াসিন নিজে তার কাছে আসেননি; বিধিমালা অনুযায়ী কাগজপত্র জমা দেওয়ায় দলিল নিবন্ধন করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, ইয়াসিন হত্যা মামলার আসামি এবং রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত। সাব-রেজিস্ট্রার তার বিষয়ে কেন জানতেন না, তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, ইয়াসিন জেলা পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে ২০টির বেশি মামলা রয়েছে। বিষয়টি পুলিশ গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখছে।



