...|...|...

ধর্ম

সত্যিকারের তাওবা করবেন যেভাবে

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৫:২৪
Shares
সত্যিকারের তাওবা করবেন যেভাবে

ছবি: সংগৃহীত

তাওবা কোনো একবার শেষ করে ফেলা অধ্যায় নয়; এটি আমৃত্যু আল্লাহর পানে ফিরে আসার এক অবিরাম যাত্রা। গুনাহ হয়ে যাওয়া মাত্রই হৃদয়ে অনুশোচনার অনুভূতির জাগরণ ঘটা প্রমাণ করে অন্তরে এখনও ঈমানের আলোটুকু অবশিষ্ট আছে। কিন্তু একই ভুলের পুনরাবৃত্তি যখন বারবার ঘটে, তখন শয়তান আমাদের মনে এক সূক্ষ্ম হতাশার বীজ বুনে দেয়—"বারবার ক্ষমা চেয়ে আবার একই পাপ করছ, তোমার এই তাওবা কি আদৌ কবুল হবে?" এই দ্বিধা আর সংকোচ থেকে মানুষ ধীরে ধীরে দোয়া ও ইবাদত ছেড়ে দূরে সরে যেতে থাকে।

তবে মনে রাখা জরুরি, আল্লাহর দরবারে ফিরে যাওয়ার জন্য আগে নিঃশ্বেস নিষ্পাপ বা নিখুঁত হওয়ার শর্ত নেই। বরং নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে তাঁর দ্বারে অবনত হওয়াটাই হলো সংশোধনের মূল ভিত্তি।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা করো।’
— সূরা আত তাহরীম, ৬৬:৮

তাওবা শুধু ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ উচ্চারণ করার নাম নয়। ইস্তিগফার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সত্যিকারের তাওবা হৃদয়ের অনুতাপ, গুনাহ থেকে সরে আসা, ভবিষ্যতে না ফেরার সংকল্প এবং মানুষের হক থাকলে সেটি ঠিক করার সঙ্গে যুক্ত।

সহজে মনে রাখার জন্য বিষয়টিকে চারটি অংশে বোঝা যায়। এগুলো কোনো হাদিসে ‘চার ধাপ’ নামে বর্ণিত হয়নি; এটি শুধু তাওবার মূল শর্তগুলো সহজে মনে রাখার একটি পদ্ধতি।

১. গুনাহটা ছেড়ে দিন

তাওবার প্রথম বাস্তব প্রমাণ হলো, যে গুনাহ থেকে তাওবা করছেন সেটি ছেড়ে দেওয়া।

আপনি যদি কোনো হারাম সম্পর্কের জন্য কাঁদেন, কিন্তু যোগাযোগ আগের মতোই চালিয়ে যান; মিথ্যার জন্য ক্ষমা চান, কিন্তু সুযোগ পেলেই আবার মিথ্যা বলেন; কোনো হারাম income নিয়ে অপরাধবোধ হয়, কিন্তু বের হওয়ার কোনো চেষ্টা না করেন—তাহলে শুধু কষ্ট পাওয়াটাই যথেষ্ট হচ্ছে না।

সত্যিকারের ফিরে আসার জন্য কখনো কিছু বাস্তব সিদ্ধান্ত দরকার হয়। কোনো নম্বর delete করতে হতে পারে, কোনো app সরাতে হতে পারে, কোনো জায়গায় যাওয়া বন্ধ করতে হতে পারে, এমন কোনো circle থেকে দূরে আসতে হতে পারে যেখানে গিয়ে বারবার একই গুনাহে পড়ে যান।

নিজেকে শুধু জিজ্ঞেস করুন, আমি কি গুনাহটা ছাড়তে চাই, নাকি শুধু গুনাহ করার পরের অপরাধবোধটা চলে যাক—এটাই চাই?

দুটো এক জিনিস নয়।

২. অন্তর থেকে অনুতপ্ত হন

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

‘অনুতাপই তাওবা।’
— সুনান ইবন মাজাহ, হাদিস ৪২৫২

অনুতাপ মানে নিজেকে ঘৃণা করা নয়। এর অর্থ হলো, অন্তরে সত্যি সত্যি অনুভব করা—’আমি আমার রবের অবাধ্য হয়েছি। এটা আমার করা উচিত হয়নি।’

এই অনুভূতিটা খুব মূল্যবান।

কিন্তু আমরা কখনো এটাকে ভুল দিকে নিয়ে যাই। ‘আমি ভুল করেছি’ থেকে গিয়ে দাঁড়াই ‘আমি-ই খারাপ, আমার আর কোনো আশা নেই।’ তারপর নিজের লজ্জার কারণে আল্লাহর কাছ থেকেই দূরে সরে যাই।

এটা তাওবার উদ্দেশ্য নয়।

সঠিক অনুতাপ মানুষকে আল্লাহর কাছে টেনে নেয়। সে ভেঙে পড়ে ঠিকই, কিন্তু সেই ভাঙা হৃদয় নিয়েই বলে, ‘ইয়া আল্লাহ, আমি ভুল করেছি। আপনি ছাড়া আমার যাওয়ার আর জায়গা নেই।’

আপনার গুনাহ মনে পড়ে চোখে পানি এলে সেই পানি আপনাকে আল্লাহ থেকে দূরে নিয়ে না যাক। বরং সেই অশ্রুই আপনার ফিরে আসার শুরু হোক।

৩. সত্যি করে সিদ্ধান্ত নিন, আমি আর ফিরতে চাই না

এখানে অনেক মানুষের ভয় হয়।

‘আগেও তো তাওবা করেছিলাম। পরে আবার গুনাহ হয়ে গেছে। এবার তাওবা করলে যদি আবার হয়ে যায়?’

তাওবার সময় আপনাকে ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দিতে বলা হয়নি। আপনাকে সত্যবাদী হতে বলা হয়েছে। এই মুহূর্তে আপনার অন্তরে সত্যিই যেন থাকে—আমি আর এই গুনাহে ফিরতে চাই না।

তাওবার সময় যদি মনে মনে পরিকল্পনা থাকে, ‘এখন ক্ষমা চাই, পরে আবার করব,’ তাহলে সেটা খাঁটি তাওবার মনোভাব নয়। কিন্তু আপনি আজ সত্যিই ছাড়তে চাইলেন, পরে দুর্বল হয়ে আবার পড়ে গেলেন—তাহলে নতুন করে আবার ফিরে আসবেন।

মানুষ দুর্বল হতে পারে। কিন্তু আল্লাহর দরজা থেকে নিজেকে দূরে রাখার অনুমতি এই দুর্বলতা দেয় না।

রাসূলুল্লাহ ﷺ জানিয়েছেন, আল্লাহ দিন ও রাত বান্দার তাওবার সুযোগ রাখেন। অর্থাৎ আপনি পড়ে গেছেন বলে দরজা বন্ধ হয়ে যায়নি।

তাই গুনাহের পর নিজেকে এই কথা বলবেন না, ‘এবার আর কী লাভ?’

বরং বলুন, ‘আমি আবার ফিরব।’

৪. মানুষের হক নষ্ট করে থাকলে সেটা ঠিক করুন

এই অংশটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

আপনার গুনাহ যদি শুধু আপনার এবং আল্লাহর মধ্যকার হয়, তাহলে আল্লাহর কাছে তাওবা করবেন। কিন্তু আপনার ভুলের কারণে যদি অন্য একজন মানুষের অধিকার নষ্ট হয়ে থাকে, তাহলে শুধু নিজের ক্ষমার জন্য দু‘আ করেই দায়িত্ব শেষ হয় না।

কারও টাকা নিয়েছেন? ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করুন। কারও সম্পদ অন্যায়ভাবে নিয়েছেন? ফেরত দিন। প্রতারণা করেছেন? যতটুকু সম্ভব ক্ষতি ঠিক করুন। কারও পাওনা আটকে রেখেছেন? সামর্থ্য অনুযায়ী পরিশোধের ব্যবস্থা করুন।

রাসূলুল্লাহ ﷺ সতর্ক করেছেন, কারও সম্মান বা অন্য কোনো অধিকারে জুলুম করে থাকলে দুনিয়াতেই তার সঙ্গে বিষয়টি মিটিয়ে নিতে, কারণ আখিরাতে টাকা দিয়ে হিসাব মেটানোর সুযোগ থাকবে না।

তবে সব ক্ষেত্রে সরাসরি গিয়ে সব কথা বলে দেওয়া সঠিক পদ্ধতি নাও হতে পারে, বিশেষ করে গীবত, সম্মানহানি বা এমন কোনো বিষয় যেখানে কথা প্রকাশ করলে আরও বড় ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ধরনের জটিল পরিস্থিতিতে বিশ্বস্ত আলেমের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

মূল কথা হলো, তাওবা নিজের সঙ্গে অন্য মানুষের অধিকারকেও গুরুত্ব দিতে শেখায়।

এখন হয়তো এই পোস্ট পড়তে পড়তে আপনার মনে নির্দিষ্ট কোনো ভুলের কথা চলে এসেছে। এমন কিছু, যেটা আপনি বহুদিন ধরে কাউকে বলেননি। মানুষ জানে না, কিন্তু আপনি জানেন। আর আল্লাহও জানেন।

এখানেই শয়তান আপনাকে একটা ভয়ংকর কথা বলতে পারে, ‘এতকিছুর পরও তুমি আল্লাহর কাছে যাবে?’

আল্লাহ নিজেই এর উত্তর দিয়েছেন,

‘হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর সীমালঙ্ঘন করেছ! তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন।’
— সূরা আয যুমার, ৩৯:৫৩

এই আয়াত গুনাহকে হালকা করে দেখানোর জন্য নয়। বরং যে মানুষ সত্যি সত্যি ফিরে আসতে চায়, তাকে নিরাশ না হওয়ার শিক্ষা দেয়।

আপনি যত দূরেই গিয়ে থাকুন, ফিরে আসার রাস্তা আল্লাহর দিকে।

তাই আজ নিজের কাছে চারটি প্রশ্ন রাখুন: গুনাহটা আমি সত্যিই ছেড়েছি কি? ভেতর থেকে অনুতপ্ত কি? সত্যিই আর না ফেরার সিদ্ধান্ত আছে কি? আর কারও হক নষ্ট হয়ে থাকলে সেটা ঠিক করার চেষ্টা করছি কি?

এই চারটার উত্তর সৎভাবে দিলে আপনি নিজের অবস্থাটা অনেক পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারবেন।

আর একটা কথা খুব মনে রাখুন: তাওবার মানে এই নয় যে এরপর জীবনে আর কোনোদিন ভুল হবে না। আপনি আবার দুর্বল হতে পারেন। আবার পড়ে যেতে পারেন। কিন্তু প্রতিবার পড়ে গিয়ে যদি আল্লাহর দিকে ফিরে আসেন, তাহলে সেই ফিরে আসাটাকে ছোট করে দেখবেন না।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

‘আদম সন্তানের প্রত্যেকেই ভুল করে, আর ভুলকারীদের মধ্যে উত্তম তারা, যারা তাওবা করে।’
— সুনান ইবন মাজাহ, হাদিস ৪২৫১

এই হাদিসের মধ্যে অদ্ভুত একটা সান্ত্বনা আছে। ভালো মানুষ মানে এমন কেউ নয় যে কখনো ভুল করেনি। ভালো মানুষের পরিচয়ের একটি অংশ হলো, ভুলের পর সে কোন দিকে ফিরে যায়।

তাই গুনাহের কারণে নিজের পরিচয়টাই বদলে ফেলবেন না। আপনি ‘শেষ হয়ে যাওয়া একজন মানুষ’ নন। আপনি এমন একজন বান্দা, যার জন্য ফিরে আসার দরজা এখনো খোলা।

আজ একটা বাস্তব কাজ করুন।

যে গুনাহটা ছাড়তে চান, তার সবচেয়ে কাছের দরজাটা বন্ধ করুন। মানুষের কোনো হক থাকলে হিসাব লিখে নিন। সম্ভব হলে দুই রাকাত সালাত পড়ে আল্লাহর কাছে নিজের ভাষায় কথা বলুন। সাজানো দু‘আ না পারলেও বলুন,

‘ইয়া আল্লাহ, আমি ভুল করেছি। আমি আপনার কাছ থেকে পালাতে চাই না। আমাকে এই গুনাহ থেকে বের করে দিন।’

সবচেয়ে বড় ক্ষতি এই নয় যে আপনি কোনোদিন গুনাহে পড়ে গেছেন। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে, ফিরে আসার সুযোগ থাকা অবস্থায়ও আপনি ফিরে এলেন না।

তাই তাওবা পিছিয়ে রাখবেন না।

আল্লাহর কাছে ফিরে আসুন নিখুঁত হয়ে নয়, সত্যি হয়ে।

আল্লাহ আমাদের গুনাহ চিনতে দিন, খাঁটি অনুতাপ দান করুন, গুনাহ ছেড়ে আসার শক্তি দিন, মানুষের হক যথাযথভাবে আদায় করার তাওফিক দিন এবং আমাদের এমন তাওবা নসিব করুন, যার পর তিনি আমাদের অন্তর ও জীবন সত্যিই বদলে দিন। আমিন।

সূত্র: Nahwa Ad-Deen