...|...|...

বিনোদন

শোবিজে একের পর এক ভাঙছে সংসার, কেন বাড়ছে বিচ্ছেদের তালিকা

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ১১:২২ | আপডেট: ৫ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ১১:২৯
Shares
শোবিজে একের পর এক ভাঙছে সংসার, কেন বাড়ছে বিচ্ছেদের তালিকা

ছবি: এআই জেনারেটেড

বিয়ে, প্রেম আর সম্পর্ক নিয়ে বরাবরই আলোচনায় থাকেন বিনোদন অঙ্গনের তারকারা। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিয়ের খবরের পাশাপাশি তারকাদের বিচ্ছেদের খবরও যেন নিয়মিতই আসছে। একেকটি বিচ্ছেদের খবর ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হচ্ছে আলোচনা, নানা জল্পনা-কল্পনা। সর্বশেষ সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে সংগীতশিল্পী ও অভিনেতা প্রীতম হাসান এবং মডেল-অভিনেত্রী ও গায়িকা শেহতাজ মনিরা হাশেমের নাম। 

দীর্ঘ ১০ বছরের সম্পর্ক ও দাম্পত্য জীবনের পর আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন তারা। তাদের ভাষ্য, পারস্পরিক বোঝাপড়ার কিছু বড় পার্থক্যের কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি হঠাৎ করে হয়নি। বর্তমানে তারা বিবাহবিচ্ছেদের প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছেন।

এর আগে চলতি বছরই বিচ্ছেদের খবর দিয়ে আলোচনায় আসেন সংগীতশিল্পী ও অভিনেতা তাহসান খান এবং রোজা আহমেদ। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বিয়ে করা এই দম্পতির সম্পর্ক নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই নানা গুঞ্জন চলছিল। পরে তাহসান নিজেই নিশ্চিত করেন, তাদের বিচ্ছেদের ঘটনা সত্য এবং তারা বেশ কিছুদিন ধরেই আলাদা থাকছেন। তবে বিচ্ছেদের নির্দিষ্ট কারণ তখন প্রকাশ্যে আনেননি তিনি।

২০২৬ সালের মার্চে বিচ্ছেদের পথে হাঁটার খবর আসে অভিনেত্রী মৌসুমী হামিদ ও নাট্যকার আবু সাইয়িদ রানার। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বিয়ে করেছিলেন তারা। বিচ্ছেদের খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে মৌসুমী জানিয়েছিলেন, এ বিষয়ে বিস্তারিত বলার মতো অবস্থায় তিনি নেই।

২০২৫ সালেও শোবিজে একাধিক বিচ্ছেদের খবর সামনে আসে। সংগীতশিল্পী দিলশাদ নাহার কণা ও গোলাম মোহাম্মদ ইফতেখারের ছয় বছরের সংসারের ইতি ঘটে ওই বছরের জুনে। কণা নিজেই বিচ্ছেদের কথা জানান।

বছরের শেষ দিকে বিচ্ছেদের খবর আসে সংগীতশিল্পী মৌসুমী আক্তার সালমার সংসারে। ২০১৮ সালে আইনজীবী সানাউল্লাহ নূর সাগরকে বিয়ে করেছিলেন তিনি। ২০২৫ সালের ২৯ নভেম্বর তাদের বিচ্ছেদ হয় বলে সালমা নিজেই নিশ্চিত করেন। তার সাবেক স্বামীও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচ্ছেদের বিষয়টি জানিয়ে বলেন, পারস্পরিক মতের অমিল, চিন্তা ও মানসিকতার দূরত্বই তাদের আলাদা হওয়ার কারণ।

একই বছর প্রকাশ্যে আসে অভিনেতা রাশেদ মামুন অপুর বিচ্ছেদের খবর। সংবাদপাঠিকা মমরেনাজ মোমোর সাথে তার সংসার ভেঙেছিল প্রায় ছয় বছর আগে। তবে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে।

এর আগে ২০২৪ সালেও শোবিজে একাধিক আলোচিত বিচ্ছেদ ঘটে। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহি স্বামী রকিব সরকারের সাথে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তের কথা জানান। ২০২১ সালে তাদের বিয়ে হয়েছিল। একই বছরের জুলাইয়ে প্রায় সাড়ে নয় বছরের দাম্পত্য জীবনের ইতি টানেন অভিনেতা আরিফিন শুভ ও অর্পিতা সমাদ্দার। দুজনের বিচ্ছেদ ছিল পারস্পরিক সিদ্ধান্তে।

আরও আগে আলোচনায় ছিল পরীমণি ও শরিফুল রাজের বিচ্ছেদ। ২০২৪ সালে তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েন ও আলাদা থাকার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। তাদের বিচ্ছেদের পর সন্তানকে ঘিরে দুজনের যোগাযোগ নিয়েও নানা খবর প্রকাশিত হয়।

তবে শোবিজে বিচ্ছেদের এই তালিকা আরও দীর্ঘ। তাহসান-মিথিলা, নোভা-রায়হান, হাবিব-রেহান, শখ-নিলয়, বাঁধন-সনেট, হৃদয় খান-সুজানা, মিলা-পারভেজ সানজারির মতো আলোচিত জুটির সংসারও বিভিন্ন সময়ে ভেঙেছে। ফলে গত এক দশকে বিনোদন অঙ্গনে বিয়ে ও বিচ্ছেদ দুটোই তারকাদের ব্যক্তিজীবনের আলোচিত অংশ হয়ে উঠেছে।

কেন ভাঙছে তারকাদের সংসার?

তারকাদের বিচ্ছেদের কারণ একেক দম্পতির ক্ষেত্রে একেক রকম। ফলে সব বিচ্ছেদকে একই কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। বরং সংশ্লিষ্ট তারকারা প্রকাশ্যে যে কারণগুলো বলেছেন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাব, মতের অমিল, জীবনযাপন ও চিন্তাধারার পার্থক্য এবং দাম্পত্য সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হওয়া।

প্রীতম-শেহতাজের ক্ষেত্রেও প্রকাশ্যে এসেছে ‘পারস্পরিক বোঝাপড়ার কিছু বড় পার্থক্য’-এর কথা। সালমার বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে তার সাবেক স্বামী বলেছেন, মতের অমিল, চিন্তা ও মানসিকতার দূরত্বের কথা। অন্যদিকে তাহসান-রোজার বিচ্ছেদের নির্দিষ্ট কারণ এখনো তারা প্রকাশ্যে জানাননি। ফলে তারকাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে নানা দাবি বা গুঞ্জন ছড়ায়, সেগুলোকে নিশ্চিত কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

তারকারা কি সত্যিই বেশি বিচ্ছেদ করছেন?

এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন রয়েছে—শোবিজ অঙ্গনে কি সত্যিই সাধারণ মানুষের তুলনায় বিচ্ছেদ বেশি? এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য আলাদা কোনো পরিসংখ্যান নেই। তাই ‘তারকারাই বেশি বিচ্ছেদ করছেন’—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।

তবে সাধারণ বাংলাদেশি সমাজে বিবাহবিচ্ছেদের প্রবণতা যে বেড়েছে, সরকারি পরিসংখ্যানেও তার ইঙ্গিত রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৩ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশে প্রতি ১০ হাজার মানুষের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদের হার ছিল ১১ জন। ২০২০ সালে এ হার ছিল ৮, ২০২১ সালে ৭ এবং ২০২২ সালে ১৪।

অর্থাৎ শোবিজের তারকারাও বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের বাইরে নন। বরং তাদের ব্যক্তিগত জীবনের খবর প্রকাশ্যে আসায় বিষয়টি সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও বাড়াচ্ছে দৃশ্যমানতা

আগে কোনো তারকার সংসারে সমস্যা হলেও সেটি অনেক সময় ঘনিষ্ঠ মহলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত। এখন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারকারাই নিজেদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সরাসরি জানিয়ে দেন। ফলে বিচ্ছেদের খবর মুহূর্তেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

প্রীতম-শেহতাজের ক্ষেত্রেও সংবাদমাধ্যমে গুঞ্জনের আগে তারা নিজেরাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। একইভাবে কণা, মাহিয়া মাহি ও সালমার মতো তারকারাও নিজেদের বিচ্ছেদের খবর সরাসরি জানিয়েছেন।

ফলে এখন বিচ্ছেদ শুধু একটি পারিবারিক ঘটনা নয়, তা দ্রুতই জনআলোচনার বিষয়ে পরিণত হচ্ছে।

বদলেছে সম্পর্কের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিও

সমাজবিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণেও দাম্পত্য সম্পর্কের পরিবর্তিত বাস্তবতার বিষয়টি উঠে এসেছে। বাংলাদেশে বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে গবেষণায় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, নারীর শিক্ষা ও কর্মসংস্থান, নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা এবং সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রত্যাশা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো আলোচনায় এসেছে।

আবার বিভিন্ন গবেষণায় দাম্পত্য কলহের সঙ্গে পরকীয়া, অবিশ্বাস, শ্বশুরবাড়ির হস্তক্ষেপ, বহুবিবাহ, আসক্তি, সহিংসতা এবং মতের অমিলের মতো বিষয়ও উঠে এসেছে।

তাই তারকাদের ক্ষেত্রেও সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার পুরোনো সামাজিক চাপ কিছুটা কমেছে বলে মনে করা যায়। আগে জনপ্রিয় ব্যক্তি বা তারকা হওয়ায় সংসার টিকিয়ে রাখাকে অনেক সময় সামাজিক মর্যাদার প্রশ্ন হিসেবে দেখা হতো। এখন ব্যক্তিগত শান্তি, স্বাধীনতা ও পারস্পরিক সম্মানকেও অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

আলোচনার কেন্দ্রে আসছে ‘ডিভোর্স কালচার’

তারকাদের বিচ্ছেদের খবর যত বেশি প্রকাশ্যে আসছে, ততই প্রশ্ন উঠছে—বিয়ে কি এখন আগের তুলনায় কম স্থায়ী হয়ে যাচ্ছে?

বাস্তবতা হলো, শুধু তারকাদের বিচ্ছেদের খবর দিয়ে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। কারণ তারকাদের সম্পর্ক গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক বেশি দৃশ্যমান। সাধারণ মানুষের হাজারো বিচ্ছেদ সংবাদে আসে না; কিন্তু একজন জনপ্রিয় অভিনেতা, গায়ক বা নির্মাতার বিচ্ছেদ সহজেই জাতীয় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।

ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শোবিজে বিচ্ছেদের ‘তালিকা বড় হচ্ছে’—এমন অনুভূতি তৈরি হলেও, এর পেছনে একদিকে যেমন বাস্তব দাম্পত্য সংকট রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে তারকাদের ব্যক্তিজীবনের বাড়তি প্রচার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তার।

সবশেষে প্রীতম-শেহতাজের বিচ্ছেদের ঘটনাটিও যেন সেই বাস্তবতাই সামনে আনল। দীর্ঘ ১০ বছরের সম্পর্কের পরও দুজন জানিয়েছেন, পারস্পরিক বোঝাপড়ার কিছু বড় পার্থক্যের কারণে আলাদা হয়ে যাওয়াই তাদের কাছে ভালো মনে হয়েছে। অর্থাৎ তারকাদের ক্ষেত্রেও সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেয়ে কখনো কখনো সম্মানজনকভাবে আলাদা হয়ে যাওয়াকেই তারা বেছে নিচ্ছেন।