...|...|...

লাইফস্টাইল

শিশুর শরীরে যে ৪ লক্ষণ ক্যানসারের ইঙ্গিত দেয়

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, সন্ধ্যা ৬:২৯
Shares
শিশুর শরীরে যে ৪ লক্ষণ ক্যানসারের ইঙ্গিত দেয়

ছবি: সংগৃহীত

অতিরিক্ত ক্লান্তি, ফ্যাকাশে ত্বক, বিনা কারণে শরীরে কালচে দাগ বা চোটের চিহ্ন এবং ক্রমবর্ধমানে টিউমার বা গুটি—এই লক্ষণগুলো শিশুদের ক্যানসারের পূর্বলক্ষণ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। সাধারণ কোনো অসুস্থতা বা ক্লান্তি ভেবে এসব লক্ষণ অবহেলা না করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

পাকিস্তানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘সামা টিভি’-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিশুদের ক্যানসার তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও এর প্রাথমিক লক্ষণগুলোকে অনেক সময় সাধারণ রোগ, ছোটখাটো আঘাত বা দৈনন্দিন ক্লান্তি বলে ভুল করা হয়, যার ফলে রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেছেন যে, যেসব লক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী হয়, সময়ের সাথে সাথে আরও খারাপ হয় অথবা একসাথে দেখা দেয়, অভিভাবকদের সেগুলোর প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া উচিত এবং প্রয়োজন সাপেক্ষে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

যুক্তরাজ্যের ক্যানসার গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রতিবছর ১৪ বছর বা তার কম বয়সী প্রায় ১ হাজার ৯০০ শিশুর ক্যানসার শনাক্ত হয়। এছাড়া যুক্তরাজ্যে ১৫ বছরের কম বয়সীদের অসুস্থতাজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলো এই ক্যানসার।

অভিভাবকদের যে ৪টি লক্ষণ খেয়াল রাখতে হবে

শিশুদের ক্যানসার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বব ফিলিপস অভিভাবকদের একক কোনো লক্ষণে মনোযোগ না দিয়ে লক্ষণগুলোর সামগ্রিক প্যাটার্ন বা ধরন বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছেন। যেসব লক্ষণ দেখা দিলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত, তা হলো:

অব্যাহত ক্লান্তি: পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরও অস্বাভাবিক বা তীব্র ক্লান্তি যা দূর হয় না।

ফ্যাকাশে ত্বক: কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই ত্বকে যে লক্ষণীয় ফ্যাকাশে ভাব দেখা দেয়।

অকারণে শরীরে কালচে দাগ: স্পষ্ট কোনো আঘাত ছাড়াই শরীরে কালশিটে পড়া, বিশেষ করে যখন তা বারবার দেখা দেয় বা বৃদ্ধি পায়।

স্থায়ী গুটি বা ফোলাভাব: এমন কোনো চাকা বা গুটি যা সহজে সারে না বা ক্রমাগত বড় হতে থাকে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, এই লক্ষণগুলোর মানেই যে শিশু ক্যানসারে আক্রান্ত, তা নয়; কারণ এগুলোর পেছনে আরও অনেক সাধারণ কারণ থাকতে পারে। তবে লক্ষণগুলো যদি স্থায়ী হয়, আরও খারাপ হয় কিংবা অন্য কোনো উদ্বেগজনক পরিবর্তনের সাথে দেখা দেয়, তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

অপরিচিত কালশিটে দাগ যেভাবে ক্যানসার শনাক্তে সাহায্য করেছিল

অস্বাভাবিক লক্ষণগুলো চেনার গুরুত্ব বোঝাতে ১৩ বছর বয়সী অ্যামেলিয়া ক্যারল-এর উদাহরণ দেওয়া হয়েছে, যাকে এক প্রকার রক্তের ক্যানসার বা অ্যাকিউট মাইয়েড ল্যুকিমিয়া-এ আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছিল।

তার মা গেমার ভাষ্য অনুযায়ী, অ্যামেলিয়া প্রথমে সামান্য শারীরিক পরিশ্রমের পরই অতিরিক্ত ক্লান্তি ও শ্বাসকষ্ট অনুভব করত। পরিবারটি প্রথমে ভেবেছিল শারীরিক ফিটনেসের অভাব বা স্কুল শেষের ক্লান্তি থেকেই এমনটি হচ্ছে। তবে অ্যামেলিয়ার শরীরে বিনা কারণে কালশিটে দাগ বা নীলচে দাগ দেখা দিতে শুরু করলে তাদের উদ্বেগ বেড়ে যায়। প্রথম দাগটি দেখা দেওয়ার তিন দিন পর তার পায়ের মাংসপেশিতে আরও দাগ দেখা দেয়, যার সঙ্গে ফোলাভাব ও ব্যথাও যুক্ত হয়।

পরবর্তীতে চোখের একটি রুটিন পরীক্ষার সময় চিকিৎসকরা তার চোখের ভেতরের ক্ষুদ্র রক্তনালীগুলো ফেটে যাওয়ার লক্ষণ দেখতে পান। এরপর চিকিৎসকরা আরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান এবং পরিবারের মাঝে উদ্বেগ তৈরি হওয়ার ১০ দিনের মধ্যেই অ্যামেলিয়ার ল্যুকিমিয়া ধরা পড়ে। বর্তমানে সে হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থতার পর্যায়ে রয়েছে। প্রতি তিন মাস পর পর তার রক্ত ও অস্থিমজ্জার পরীক্ষা করা হয় এবং সে ইতিমধ্যে স্কুলেও ফিরে গেছে।

‘রুল অব থ্রি’ বা তিনের নিয়ম কী?

শিশু ক্যানসারের লক্ষণগুলো সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে ‘চিলড্রেনস ক্যানসার অ্যান্ড ল্যুকিমিয়া গ্রুপ’ অভিভাবক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য একটি সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাচ্ছে।

এই প্রচারণায় চিকিৎসকদের জন্য ‘রুল অব থ্রি’ বা তিনের নিয়ম মেনে চলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই নিয়ম অনুযায়ী, কোনো শিশুর মধ্যে যদি তিনটি স্থায়ী লক্ষণ থাকে, তিনি যদি তিনটি পৃথক মেডিকেল চেকআপে অংশ নেন কিংবা টানা তিন সপ্তাহ ধরে অব্যহত বা অস্পষ্ট লক্ষণগুলোর মুখোমুখি হন, তবে আরও উন্নত মূল্যায়ন বা বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

এই পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য হলো স্বাস্থ্যকর্মীদের এমন সব উপসর্গ চিহ্নিত করতে সাহায্য করা, যা অন্যথায় এড়িয়ে যাওয়া হতে পারে। তবে এটি কোনো চূড়ান্ত রোগ নির্ণয় পরীক্ষা নয় এবং শিশুর অবস্থার অবনতি হলে অভিভাবকদের তিন সপ্তাহের জন্য অপেক্ষা করা উচিত নয়।

প্রাথমিক রোগ নির্ণয় চিকিৎসার সম্ভাবনা বাড়ায়

১৯৭০-এর দশক থেকে যুক্তরাজ্যে শিশুদের ক্যানসার নিরাময়ের হার উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্যানসারে আক্রান্ত শিশুদের মধ্য থেকে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৮ জনের বেশি শিশু ৫ থেকে ১০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে বেঁচে থাকে।

অধ্যাপক ফিলিপস বলেন, দ্রুত রোগ নির্ণয় করা গেলে কিছু শিশুর ক্ষেত্রে কম জটিল বা কম তীব্র চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন যে, যুক্তরাজ্যে ক্যানসারে আক্রান্ত প্রায় অর্ধেক শিশুর ক্ষেত্রেই প্রথম লক্ষণ দেখা দেওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যে রোগটি ধরা পড়ে। তবে অন্যদের ক্ষেত্রে এই বিলম্ব অনেক দীর্ঘ হয়, যা কখনও কখনও বেশ কয়েক মাস পর্যন্ত গড়ায়। এই প্রচারণার মূল লক্ষ্য হলো পরিবার ও চিকিৎসকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়িয়ে এই বিলম্বের সময় কমিয়ে আনা।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

শিশুর যদি দীর্ঘস্থায়ী ও অব্যহত ক্লান্তি, অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে ভাব, বারবার কালশিটে পড়া, শরীরে ক্রমবর্ধমান গুটি বা অন্য কোনো লক্ষণ দেখা দেয় যা ভালো হচ্ছে না, তবে অভিভাবকদের অবিলম্বে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

পাশাপাশি, লক্ষণগুলোর অবনতি হলে কিংবা একসঙ্গে একাধিক উদ্বেগজনক পরিবর্তন লক্ষ করলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। এই সতর্কবার্তাগুলো ক্যানসারের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়, তবে সময়মতো মূল্যায়ন করা হলে এর আসল কারণ খুঁজে বের করা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা যথাসম্ভব দ্রুত শুরু করা সম্ভব হয়।