...|...|...

ক্যাম্পাস

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের তাগিদ

ঢাবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬, সন্ধ্যা ৬:৩৯ | আপডেট: ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১:৫৩
Shares
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের তাগিদ

‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের চ্যালেঞ্জ: আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও জাতীয় অগ্রাধিকার’ শীর্ষক সেমিনার। ছবি: টাইমস টুডে

রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘস্থায়ী সমাধানে মানবিক সহায়তার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলেছেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে মিয়ানমারের রাজনৈতিক বাস্তবতা, নাগরিকত্ব, অধিকার এবং রাখাইন রাজ্যে সুশাসনের বিষয়গুলোকে প্রত্যাবাসন আলোচনার কেন্দ্রে আনতে হবে।

সোমবার (২৪ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের চ্যালেঞ্জ: আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও জাতীয় অগ্রাধিকার’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ (সিজিএস) ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের হিট (হিইট) প্রকল্প যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।

সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামসুল ইসলাম। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান এবং সিজিএসের পরিচালক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ এস এম আলী আশরাফ উপস্থিত ছিলেন।

উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনই বাংলাদেশ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অভিন্ন লক্ষ্য। এ সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কৌশলগত ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

প্রধান অতিথি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামসুল ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গা সংকট শুধু মানবিক বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, কূটনীতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ।

দীর্ঘমেয়াদি ক্যাম্পজীবন, ক্যাম্পের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং মিয়ানমারের চলমান সংঘাতকে প্রত্যাবাসনের বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগের সঙ্গে কার্যকর নিরাপত্তা কৌশলের সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সেমিনারের প্যানেল আলোচনায় মালয়েশিয়ান অ্যাডভাইজরি গ্রুপ অন মিয়ানমারের হেড অব সেক্রেটারিয়েট লিলিয়ান ফ্যান বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরও জোরদার করতে হবে। প্রত্যাবাসন আলোচনায় আইনি ও রাজনৈতিক বিষয়গুলোকে কেন্দ্রে রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

আসিয়ানকে আরও সমন্বিত ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে লিলিয়ান ফ্যান বলেন, পাঁচ দফা ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাজনৈতিক লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। একইসাথে সহিংসতা বন্ধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংলাপ এবং মানবিক সহায়তার সাথে রোহিঙ্গা ইস্যুকে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রহীনতা ও বঞ্চনার মূল কারণ সমাধানে আইনি, রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংস্কার প্রয়োজন। প্রত্যাবাসন শুধু নিরাপদে ফিরে যাওয়ার বিষয় নয়; এর সাথে মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিবর্তন, রাখাইন রাজ্যে সুশাসন এবং রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ও জড়িত।

লিলিয়ান ফ্যান আরও বলেন, প্রত্যাবাসনকে রোহিঙ্গাদের জাতিগত স্বীকৃতি, নাগরিকত্ব, রাজনৈতিক অধিকার, চলাফেরার স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও সম্পত্তির অধিকারের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া ও আসিয়ানকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সহিংসতা ও বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব ব্যবস্থার মতো সংকটের মূল কারণগুলোর সমাধান ছাড়া টেকসই প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে বাংলাদেশের জাতীয় অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

সেমিনারে অনুষ্ঠিত দুটি প্যানেল আলোচনায় রোহিঙ্গা প্রতিনিধি, গবেষক, কূটনীতিক, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ এবং মিয়ানমার-বিষয়ক বিশ্লেষকেরা অংশ নেন।

আলোচনায় রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি, আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের বিভিন্ন দিক উঠে আসে।

আলোচকরা বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান শুধু বাংলাদেশ-মিয়ানমারের দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। জাতিসংঘ, আসিয়ানসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফোরামের মাধ্যমে সমন্বিত কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি প্রত্যাবাসন-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গাদের কণ্ঠস্বরকে অর্থবহভাবে যুক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তারা।

সেমিনারে বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, আলোচনায় উঠে আসা সুপারিশগুলো রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জাতীয় কৌশল প্রণয়ন, কূটনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং গবেষণা ও নীতিনির্ধারণে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।