আত্মশুদ্ধি, সংযম ও আল্লাহর নৈকট্য লাভে নিয়মিত ইবাদতের বিকল্প নেই। রাসূলুল্লাহ (সা.) সারা বছর বিভিন্ন নফল ইবাদত করতেন। হজরত আয়েশা (রা.) ও উম্মে সালামা (রা.)-এর বর্ণনায় তার তিনটি বিশেষ আমলের কথা উঠে এসেছে-তাহাজ্জুদ নামাজ, প্রতি চান্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা এবং রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ। এসব আমল মুসলমানদের জন্য সুন্নত অনুসরণ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
ইসলামে ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম নামাজ হিসেবে রাতের নামাজের কথা বলা হয়েছে। সহিহ মুসলিমের ৪০৫ নম্বর হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম নামাজ হলো রাতের নামাজ। তাহাজ্জুদ নামাজের মাধ্যমে একজন মুমিন নির্জন রাতে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হতে পারেন এবং তার কাছে ক্ষমা ও সাহায্য চাইতে পারেন।
পবিত্র কোরআনের সুরা ইসরার ৭৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে রাতের একটি অংশে তাহাজ্জুদ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। এ নামাজের মাধ্যমে প্রশংসিত মর্যাদা লাভের আশার কথাও আয়াতে উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া সুরা মুজাম্মিলে রাতের ইবাদত, কোরআন তিলাওয়াত ও আল্লাহর স্মরণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
তাহাজ্জুদ আদায়ের উত্তম সময় রাতের শেষ তৃতীয়াংশ। ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগে এ নামাজ আদায় করা যায়। সাধারণত এশার নামাজের পর ঘুমিয়ে উঠে তাহাজ্জুদ পড়া হয়। দুই রাকাত করে সামর্থ্য অনুযায়ী এ নামাজ আদায় করা যায়। নিয়মিত তাহাজ্জুদ আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করা যায়।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিয়মিত আমলগুলোর মধ্যে আরও ছিল প্রতি চান্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে নফল রোজা রাখা। এই দিনগুলোকে ইসলামী পরিভাষায় আইয়ামে বিজ বলা হয়। এ তিন দিনে রোজা রাখা নফল ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। চান্দ্রমাসের নির্দিষ্ট দিনগুলোতে রোজা রাখার অভ্যাস একজন মুসলমানকে নিয়মিত ইবাদতে অভ্যস্ত হতে সাহায্য করে।
তার তৃতীয় বিশেষ আমল ছিল রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করা। ইতিকাফের মাধ্যমে একজন মুসলমান দুনিয়াবি ব্যস্ততা থেকে নিজেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন রেখে নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও জিকিরে সময় কাটান। বিশেষ করে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধানের জন্য রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এটি রমজান মাসের নির্দিষ্ট সময়ের আমল হলেও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নত হিসেবে মুসলমানদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
হজরত আয়েশা (রা.) ও উম্মে সালামা (রা.)-এর বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এসব আমলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর রাতের ইবাদতের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের নামাজে উৎসাহিত করার কথাও এসেছে। আবু দাউদ ও নাসায়ির বর্ণনায় রয়েছে, কোনো ব্যক্তি রাতে উঠে নামাজ আদায় করেন এবং তার স্ত্রীকেও জাগিয়ে দেন, এরপর দুজন নামাজ আদায় করেন-তাদের প্রতি আল্লাহ রহম করেন।
সহিহ বুখারির ৬৫০২ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ জানিয়েছেন, বান্দা ফরজ ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য লাভ করে এবং নফল ইবাদতের মাধ্যমে আরও নিকটবর্তী হতে থাকে। একপর্যায়ে আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন। এ বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি নফল আমলও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
তাই তাহাজ্জুদ নামাজ, আইয়ামে বিজের রোজা ও রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ-এই তিনটি আমল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নত অনুসরণের ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এর মধ্যে তাহাজ্জুদ ও আইয়ামে বিজের রোজা সারা বছর পালন করা যায়, আর ইতিকাফের বিশেষ সুযোগ আসে রমজানের শেষ দশকে। সামর্থ্য অনুযায়ী এসব আমলের চর্চা একজন মুসলমানের আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উন্নতিতে ভূমিকা রাখতে পারে।


