...|...|...

ক্যাম্পাস

রাবির আবাসিক হলগুলোতে সাপের উপদ্রব, আতঙ্কে শিক্ষার্থীরা

রাবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ১১:০৭ | আপডেট: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১:০০
Shares
রাবির আবাসিক হলগুলোতে সাপের উপদ্রব, আতঙ্কে শিক্ষার্থীরা

ছবি: সংগৃহীত

মশারির ওপর বিষধর কালাচ, হলের নিচতলায় গোখরা, জুতোর ভেতর সাপ- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) আবাসিক হলগুলোতে গত দুই মাসে একের পর এক সাপ উদ্ধারের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। কখনও শয়নকক্ষ, কখনও করিডোর, আবার কখনও হলের নিচতলায় মিলছে সাপের সন্ধান। উদ্ধার হওয়া সাপগুলোর অধিকাংশ নির্বিষ হলেও বিষধর গোখরা ও কালাচের উপস্থিতি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।

তবে সাপের আনাগোনা শুধু আবাসিক আসলেই সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কোয়ার্টারের বসতবাড়ি, পোষা পাখির খাঁচা ও এসির ভেতর, একাডেমিক ভবনের ল্যাব, সাইকেল এমনকি আইবিএ ক্যান্টিনের রান্নাঘরেও সাপ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। এতে পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে সাপের উপস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বন্যপ্রাণী উদ্ধারকারী সংগঠন ‘সেভ ওয়াইল্ডলাইফ অ্যান্ড নেচার (সোয়ান)’-এর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার স্বেচ্ছাসেবকেরা বন বিভাগের পরামর্শ ও নির্দেশনা অনুযায়ী এসব সাপ উদ্ধার করছেন।

সর্বশেষ শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাত আড়াইটার দিকে শহীদ শামসুজ্জোহা হলের ১২১ নম্বর কক্ষে মশারির ওপর থেকে একটি বিষধর পাতি কালাচ উদ্ধার করা হয়। খবর পেয়ে সোয়ানের স্বেচ্ছাসেবকেরা গিয়ে সাপটি উদ্ধার করেন।

এর আগে ২৮ আগস্ট বিজয়-৭১ হলের নিচতলা থেকে বিষধর খৈয়া গোখরা উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া আগস্টে মাদার বখ্শ হলের করিডোর, শাহ মখদুম হলের নিচতলায় রাখা জুতোর ভেতর এবং জুলাইয়ে মতিহার হলের একটি কক্ষ থেকেও নির্বিষ ঘরগিন্নি ও হেলে সাপ উদ্ধার করা হয়।

আবাসিক হলের পাশাপাশি শিক্ষক কোয়ার্টারগুলোতেও সাপের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। গত ৩১ আগস্ট পশ্চিমপাড়ার একটি শিক্ষক কোয়ার্টারের পাখির খাঁচা থেকে দাঁড়াশ, ২২ আগস্ট পূর্বপাড়ার লাল কোয়ার্টার থেকে প্রায় ছয় ফুট লম্বা দাঁড়াশ এবং ১৮ আগস্ট একটি বাসার এসির ইনডোর ইউনিটের ভেতর থেকে ঘরগিন্নি সাপ উদ্ধার করা হয়।

একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন ও অন্যান্য স্থাপনাতেও সাপ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী ভবনের নিচতলায় একটি সাইকেলে পেঁচিয়ে থাকা সাপ, দ্বিতীয় বিজ্ঞান ভবনের পূর্ব পাশে ফলিত রসায়ন বিভাগের ল্যাব এবং আইবিএ ক্যান্টিনের রান্নাঘর থেকেও বিভিন্ন সময়ে সাপ উদ্ধার করা হয়েছে।

সোয়ানের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ শেখ বলেন, এখন বর্ষাকাল ও এর পরবর্তী সময় চলছে। এ সময়ে সাপের আনাগোনা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। বর্ষাকালে সাপের গর্তে পানি ঢুকে যাওয়ায় তারা আশ্রয়ের সন্ধানে বেরিয়ে আসে। এ ছাড়া বিভিন্ন পোকামাকড়ের সন্ধানে সাপেরা রাতের বেলায় শিকারে বের হয়। এ সময়ে আমাদের কাছে সাপ উদ্ধারের খবরও অনেক বেশি আসে। বর্তমানে আমরা ৫০ থেকে ৭০টিরও বেশি সাপ উদ্ধারের সেবা দিয়েছি।

হলে সাপের উপদ্রব নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে শহীদ শামসুজ্জোহা হলের আবাসিক শিক্ষার্থী সাকিল আহমেদ বলেন, হলের প্রাধ্যক্ষকে অনেকবার বলেও কোনো সমাধান হয়নি। হলের চারপাশ জঙ্গল হয়ে আছে। কয়েকদিন পরপরই সাপ বের হয়। সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে অনুরোধ, হলের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।

শহীদ শামসুজ্জোহা হল সংসদের ভিপি আশিকুর রহমান সোহাগ বলেন, হলের সংযোগ পথ, বেসিন, ওয়াশরুম এমনকি উপাসনালয়েও নিয়মিত সাপের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি সাপের কামড়ে হলের এক আবাসিক শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়েছেন বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের সাথে দুই দফা সাক্ষাৎ করে ঝোপঝাড় পরিষ্কারের জন্য বৈদ্যুতিক ঘাস ছাঁটাই মেশিন এবং বিষধর সাপের প্রবেশ ঠেকাতে হলের নিচতলায় ‘স্নেক প্রটেকশন নেট’ স্থাপনের দাবি জানানো হয়েছে।

তবে তহবিল সংকটের কথা বলে হল প্রশাসন ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুধু আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এক সপ্তাহের মধ্যে এসব দাবির দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রশাসন ভবন অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে বলেও জানান সোহাগ।

শহীদ শামসুজ্জোহা হলের প্রাধ্যক্ষ ড. মো. আল-আমিন সরকার বলেন, সাপের উপদ্রব ঠেকাতে এর আগেও কার্বোলিক অ্যাসিড ব্যবহার করা হয়েছে এবং হলের চারপাশ পরিষ্কার করা হয়েছে। গত সপ্তাহেও প্রশাসনের উদ্যোগে হলের পেছনের অংশ পরিষ্কার করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, পেছনের দিক দিয়ে সাপটি হলে প্রবেশ করেছে। হলের পেছনে ভালোমানের নেট লাগানো এবং ড্রেনগুলো পুনরায় পরিষ্কার করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রাবি মেডিকেল সেন্টারের চিফ মেডিকেল অফিসার মারুফা সিদ্দীকা লিপি বলেন, বর্তমানে আমাদের মেডিকেলে কোনো অ্যান্টিভেনম নেই। তবে যেহেতু সাপের উপদ্রব বাড়ছে, আমরা দ্রুতই প্রশাসনের সাথে কথা বলে অ্যান্টিভেনমের ব্যবস্থা করব।

সাপের উপদ্রব নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পদক্ষেপের বিষয়ে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. আব্দুল আলীম বলেন, প্রতিটি আসলেই কার্বলিক অ্যাসিড দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে মেডিকেল সেন্টারকে বলা হয়েছে, সাপের কামড়ের শিকার হলে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিভেনম দ্রুত দেওয়ার ব্যবস্থা করতে।

তিনি আরও বলেন, প্রতিটি বলেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কার্যক্রম চলছে। প্রতিদিন হলের বাইরে প্রায় ২০ জন এবং ভেতরে ১৬-১৭ জন কর্মী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন।