...|...|...

লাইফস্টাইল

রান্নার ভুলেই নষ্ট হতে পারে খাবারের পুষ্টি

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬, সকাল ১১:০৬ | আপডেট: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সন্ধ্যা ৭:৫৯
Shares
রান্নার ভুলেই নষ্ট হতে পারে খাবারের পুষ্টি

খাবার স্বাস্থ্যকর কি না, তা নির্ভর করে শুধু উপকরণের ওপর নয়; রান্নার পদ্ধতিও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ। পুষ্টিকর সবজি, মাছ, ডাল কিংবা মাংসও অতিরিক্ত তেল, লবণ বা দীর্ঘ সময় ধরে রান্নার কারণে তুলনামূলক বেশি ক্যালরি, সোডিয়াম বা কম পুষ্টিমানসম্পন্ন খাবারে পরিণত হতে পারে। তাই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের আলোচনায় কী খাচ্ছি এর পাশাপাশি কীভাবে রান্না করছি, সেই প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের প্রচলিত খাদ্যতালিকায় ভাত, মাছ, ডাল, শাকসবজি ও মাংসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এসব খাবার থেকে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ ও খাদ্যআঁশ পাওয়া যায়। কিন্তু একই খাবার রান্নার ধরন ও ব্যবহৃত উপকরণের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে এর পুষ্টিগত বৈশিষ্ট্য অনেকটাই বদলে যেতে পারে।

তেল যত বেশি, ক্যালরিও তত বেশি

রান্নায় ব্যবহৃত তেলের পরিমাণ খাদ্যের মোট ক্যালরি বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তেল প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান হলেও এটি শক্তির ঘন উৎস। ফলে একই পরিমাণ সবজি বা মাছ রান্না করতে বেশি তেল ব্যবহার করলে খাবারের মোট ক্যালরি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

বাংলাদেশি রান্নায় ভাজা, কষানো ও তেলে ডুবিয়ে রান্নার প্রচলন রয়েছে। মাছ, মাংস, সবজি কিংবা বিভিন্ন নাশতা তৈরিতে অতিরিক্ত তেল ব্যবহার করলে খাবারে চর্বির পরিমাণ ও শক্তির ঘনত্ব বাড়তে পারে। বিশেষ করে নিয়মিত অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ করলে দীর্ঘমেয়াদে ওজন বৃদ্ধি ও স্থূলতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তাই স্বাস্থ্যকর রান্নার অর্থ তেল পুরোপুরি বাদ দেওয়া নয়; বরং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিমিত ব্যবহার করা। রান্নার আগে তেল মেপে নেওয়া এবং প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত তেল না দেওয়ার অভ্যাস সহজ কিন্তু কার্যকর একটি পরিবর্তন।

লবণ কমানোও রান্নার গুরুত্বপূর্ণ অংশ

খাবারের স্বাদ বাড়াতে লবণের ব্যবহার স্বাভাবিক। কিন্তু অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। উচ্চ সোডিয়াম গ্রহণ রক্তচাপ বাড়াতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।

সমস্যাটি শুধু রান্নার সময় দেওয়া লবণেই সীমাবদ্ধ নয়। আচার, সস, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং বিভিন্ন প্যাকেটজাত খাবার থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সোডিয়াম পাওয়া যেতে পারে।

তাই রান্নায় লবণ পরিমিত রাখার পাশাপাশি অতিরিক্ত লবণ দিয়ে খাবার খাওয়ার অভ্যাস কমানো জরুরি। স্বাদ বাড়াতে লেবু, ধনেপাতা, কাঁচামরিচ, রসুন, আদা ও বিভিন্ন মসলা ব্যবহার করা যেতে পারে।

বেশি সময় রান্না করলে কি পুষ্টি কমে?

সব ধরনের রান্না পুষ্টির জন্য ক্ষতিকর এমন ধারণা সঠিক নয়। রান্নার ফলে অনেক খাবার নিরাপদ, সহজপাচ্য ও শরীরের জন্য গ্রহণযোগ্য হয়। আবার কিছু পুষ্টি উপাদান রান্নার ফলে শরীরের জন্য আরও সহজলভ্য হতে পারে।

তবে অতিরিক্ত সময় ধরে রান্না করা এবং বিশেষ করে পানিতে দীর্ঘ সময় ফুটিয়ে পরে সেই পানি ফেলে দেওয়া কিছু পানিতে দ্রবণীয় ভিটামিনের ক্ষতি বাড়াতে পারে। ভিটামিন C এবং কিছু B ভিটামিন এ ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সংবেদনশীল।

এ কারণে সবজি অযথা দীর্ঘ সময় ধরে সিদ্ধ না করে প্রয়োজন অনুযায়ী রান্না করা ভালো। সম্ভব হলে অল্প পানিতে রান্না করা এবং রান্নার ঝোল বা তরল অংশ ফেলে না দেওয়াও কিছু পুষ্টি ধরে রাখতে সহায়ক হতে পারে।

ভাজা খাবারে শুধু স্বাদ নয়, বদলায় শক্তির ঘনত্বও

খাবার ভাজার সময় তেল খাবারের সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে ভাজা খাবারের শক্তির ঘনত্ব অনেক ক্ষেত্রে সেদ্ধ, বাষ্পে রান্না বা অল্প তেলে রান্না করা খাবারের তুলনায় বেশি হতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে সব ধরনের ভাজা খাবার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। খাদ্যাভ্যাসে সামগ্রিক ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রতিদিনের রান্নায় ভাজা খাবারের পরিবর্তে বাষ্পে রান্না, সেদ্ধ, গ্রিল, বেক বা অল্প তেলে রান্নার পদ্ধতি বেশি ব্যবহার করা যেতে পারে।

সবজি রান্নার ক্ষেত্রেও প্রয়োজন কৌশল

শাকসবজি আমাদের খাদ্যতালিকায় ভিটামিন, খনিজ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও খাদ্যআঁশের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু সবজি রান্নার সময় কয়েকটি বিষয় খেয়াল করা দরকার।

সবজি অতিরিক্ত সময় ধরে রান্না করা, বেশি পানিতে দীর্ঘক্ষণ সিদ্ধ করা কিংবা রান্নার পানি ফেলে দেওয়া কিছু পানিতে দ্রবণীয় ভিটামিনের ক্ষতি করতে পারে। তাই সবজি প্রয়োজন অনুযায়ী রান্না করা, অতিরিক্ত সিদ্ধ না করা এবং রান্নার পদ্ধতিতে বৈচিত্র্য রাখা ভালো।

অন্যদিকে, কিছু সবজির ক্ষেত্রে রান্না নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদানের জৈবপ্রাপ্যতা বাড়াতেও পারে। অর্থাৎ কাঁচা খাবার সবসময় রান্না করা খাবারের চেয়ে বেশি পুষ্টিকর এমন সিদ্ধান্তও ঠিক নয়।

রান্নার দক্ষতা মানে শুধু স্বাদ নয়

একজন দক্ষ রাঁধুনির পরিচয় শুধু খাবারের স্বাদে নয়; খাবারের পুষ্টিমান যতটা সম্ভব ধরে রাখার দক্ষতাতেও। একই উপকরণ ব্যবহার করেও রান্নার পদ্ধতি পরিবর্তন করে খাবারের ক্যালরি, চর্বি, সোডিয়াম ও কিছু পুষ্টি উপাদানের ওপর প্রভাব ফেলা সম্ভব।

তাই স্বাস্থ্যকর রান্নার জন্য কয়েকটি সহজ অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে তেল ও লবণ পরিমিত ব্যবহার, অতিরিক্ত ভাজা কমানো, সবজি অযথা দীর্ঘ সময় রান্না না করা, প্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যবহার সীমিত করা এবং রান্নায় বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্বাস্থ্যকর খাবারকে সুস্বাদু ও গ্রহণযোগ্য রাখাও জরুরি। পুষ্টিকর খাবার যদি স্বাদহীন বা দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তা দীর্ঘদিন অনুসরণ করা কঠিন। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত খাবারের স্বাদ ও পুষ্টির মধ্যে একটি বাস্তবসম্মত ভারসাম্য তৈরি করা।

খাদ্য নির্বাচন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, রান্নার কৌশলও তেমনই গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক উপকরণ দিয়ে তৈরি খাবার ভুল রান্নার কারণে অতিরিক্ত ক্যালরি বা সোডিয়ামের উৎস হয়ে উঠতে পারে। আবার সামান্য সচেতনতা ও রান্নার পদ্ধতিতে পরিবর্তনের মাধ্যমে একই খাবারকে আরও স্বাস্থ্যসম্মত করা সম্ভব।

অতএব, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের শুরু শুধু বাজারের তালিকা থেকে নয় রান্নাঘর থেকেও।

রাইসা মেহজাবীন, ফিটনেস পুষ্টিবিদ