রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালে প্রসবকালীন চিকিৎসায় অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের দাবি, সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পাওয়ায় জন্মের পর সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে এক নবজাতক। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ অক্টোবর শিশুটির মৃত্যু হয়। তবে নবজাতকের মৃত্যুর সাথে কথিত চিকিৎসা অবহেলার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় শোকের পাশাপাশি ক্ষোভ প্রকাশ করেছে নবজাতকের পরিবার। তাদের অভিযোগ, সিজারিয়ান অপারেশনের কথা বলে হাসপাতালের বাইরে একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। এতে প্রসব সম্পন্ন হতে দেরি হয় এবং নবজাতক সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। পরিবারের দাবি, অভিযোগটি সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
পরিবারের লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২ অক্টোবর শুক্রবার রাত আনুমানিক ৯টার দিকে বরকল উপজেলার ভূষণছড়া ইউনিয়নের দুর্গম সীমান্তবর্তী ঠেগা খুব্বাং গ্রামের বাসিন্দা সুজন চাকমার স্ত্রী নীতিষা চাকমা (২০) প্রসববেদনা নিয়ে রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন। পরদিন শনিবার প্রসববেদনা তীব্র হলে বিকেল আনুমানিক সাড়ে চারটার দিকে তাকে হাসপাতালের লেবার রুমে নেওয়া হয়। পরিবারের দাবি, বিকেল পাঁচটার দিকে নবজাতকের মাথা আংশিক বেরিয়ে এলেও প্রসব সম্পন্ন হয়নি।
এ অবস্থায় কর্তব্যরত নার্স সিজারিয়ান অপারেশনের কথা বলে হাসপাতাল সড়কের একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যাওয়ার পরামর্শ দেন বলে অভিযোগ করেছে পরিবার। তাদের ভাষ্য, আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে অস্ত্রোপচার করানো সম্ভব ছিল না। ফলে তারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যান।
অভিযোগ অনুযায়ী, বিষয়টি হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজরে আসার পর রাত আনুমানিক সাড়ে আটটার দিকে অমলা চাকমা নামের একজন জ্যেষ্ঠ নার্স এসে স্বাভাবিক প্রসব করান। তবে ততক্ষণে নবজাতকের শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছিল বলে দাবি পরিবারের।
পরে রাত সাড়ে দশটার দিকে নবজাতককে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ অক্টোবর শিশুটির মৃত্যু হয়।
প্রসবের সময় কী ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছিল, কেন প্রসব সম্পন্ন হতে এতটা সময় লেগেছিল এবং কোন পর্যায়ে কী চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল-এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে তদন্ত প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রসূতি ও নবজাতকের চিকিৎসাসংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনা করে ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করাও জরুরি।
নবজাতকের নানা জ্ঞান বিকাশ চাকমা গত ৪ অক্টোবর রাঙ্গামাটির সিভিল সার্জন ও হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। এতে প্রসবকালীন চিকিৎসায় অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার অভিযোগ তুলে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
পরিবারের অভিযোগ, সন্তান প্রসবের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার পরিবর্তে তাদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে সেই ব্যবস্থা করতে না পারায় তারা অসহায় হয়ে পড়েন।
পরিবারের সদস্যদের মতে, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা একজন অসচ্ছল প্রসূতির জন্য সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রসবের সময় মা ও নবজাতকের জীবন রক্ষায় দ্রুত ও যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
তাদের প্রশ্ন, হাসপাতালের ভেতরেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল কি না, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও নার্সরা সময়মতো দায়িত্ব পালন করেছিলেন কি না এবং প্রসবের সময় জটিলতা দেখা দেওয়ার পর যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল কি না-এসব বিষয় তদন্তে উঠে আসবে কি না।
এ বিষয়ে রাঙ্গামাটির সিভিল সার্জন নুয়েন খীসা বলেন, একটি অভিযোগ পেয়েছি। প্রকৃত ঘটনা কী হয়েছে, তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে তদন্ত কবে শুরু হবে, কারা তদন্ত করবেন, চিকিৎসার নথিপত্র ও দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বক্তব্য পর্যালোচনা করা হবে কি না এবং তদন্ত প্রতিবেদন কবে প্রকাশ করা হবে-এসব বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ এবং চিকিৎসাসংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনার মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা প্রয়োজন।


