...|...|...

ঢাকা

রঙিন কার্ডে অসামাজিক ব্যবসার প্রচার, বিপন্ন আবাসিক এলাকার পরিবেশ

রুবেল রহমান, আশুলিয়া (ঢাকা)
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ২:০৫ | আপডেট: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ২:২৪
Shares
রঙিন কার্ডে অসামাজিক ব্যবসার প্রচার, বিপন্ন আবাসিক এলাকার পরিবেশ

রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা রঙিন কার্ড।

শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ার সড়ক-মহাসড়ক কিংবা ফুটপাত দিয়ে হাঁটলেই চোখে পড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নানা রঙের ভিজিটিং কার্ড। এসব কার্ডে ব্যবহার করা হয়েছে আবাসিক হোটেল কিংবা গেস্ট হাউসের নাম। পাশাপাশি এসব রঙিন কার্ডে রয়েছে বিভিন্ন ‘দাদা-ভাইয়ের’ নাম ও মোবাইল নম্বর। কখন, কারা এসব কার্ড ছড়িয়ে দিচ্ছে-তা নিয়ে রহস্য তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

গত কয়েক দিনে সরেজমিনে আশুলিয়ার বাইপাইল, পল্লীবিদ্যুৎ, নবীনগর, ইউনিক, জামগড়া, নরসিংহপুর, ডিইপিজেড, বলিভদ্র ও শ্রীপুর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সড়কের পাশের ফুটপাত, ফুটওভার ব্রিজ, পাড়া-মহল্লার আঞ্চলিক সড়ক ও অলিগলির রাস্তা এসব রঙিন ভিজিটিং কার্ডে ছেয়ে গেছে। শুধু সড়ক কিংবা ফুটপাত নয়, বিভিন্ন স্কুল-কলেজের সামনেও পড়ে থাকতে দেখা গেছে এসব কার্ড।

সড়কে পড়ে থাকা এসব কার্ডে লেখা রয়েছে রিপন দাদা, মামুন ভাই, আকাশ ভাই, বাদল ভাই, সূর্য ভাই, রাশেদ ভাই, সামি ভাই, জসিম ভাই ও জুয়েল ভাইয়ের নাম ও মোবাইল নম্বর। এছাড়াও কিছু ভিজিটিং কার্ডে মুন গেস্ট হাউস, গোল্ডেন গেস্ট হাউস, দুবাই গেস্ট হাউস ও হোটেল হিমালয় আবাসিকসহ বিভিন্ন গেস্ট হাউস ও আবাসিক হোটেলের নাম লেখা রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যৌনকর্মী সরবরাহকারী কিছু দালাল চক্র এসব ভিজিটিং কার্ড রাস্তাঘাটে ছড়িয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব কার্ডে চক্রের নাম ও মোবাইল নম্বর দেওয়া থাকে। দ্রুত প্রচারণার উদ্দেশ্যেই এমন কৌশল নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। রাতের আঁধারে কিংবা ভোরের নিরিবিলি সময়ে তারা এসব রঙিন ভিজিটিং কার্ড সড়কে ছড়িয়ে রেখে যায়, যাতে সহজেই মানুষের নজরে আসে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সড়কের পাশে ফুটপাত, ফুটওভার ব্রিজ, পাড়া-মহল্লার আঞ্চলিক সড়ক কিংবা অলিগলিতে ছড়িয়ে থাকা এসব ভিজিটিং কার্ডে থাকা নাম ও নম্বর ব্যবহারকারীরা কয়েক ধাপে নারী যৌনকর্মী সরবরাহের কাজ করে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রথমত, ভিজিটরকে তাদের নিজস্ব আবাসিক হোটেল বা গেস্ট হাউসে ডেকে নিয়ে যৌনকর্মী সরবরাহ করা হয়। এছাড়া যৌনকর্মীকে ভিজিটরের বাসার ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়া কিংবা যৌনকর্মীর বাসা বা ফ্ল্যাটে ভিজিটরকে নিয়ে যাওয়ার কাজও করে থাকে তারা। মূলত তারা যৌনকর্মীর দালাল হিসেবে কাজ করে বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাস্তায় পড়ে থাকা হোটেল হিমালয় আবাসিকের একটি ভিজিটিং কার্ডে থাকা নম্বরে ফোন করা হলে, ফোন রিসিভকারী ব্যক্তি জানান, হোটেল হিমালয় আবাসিকে মাত্র ১ হাজার ৩৫০ টাকায় রুম পাওয়া যাবে।

যে কাউকে নিয়ে থাকা যাবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নির্ভয়ে থাকা যাবে।’ আর রাত্রিকালীন (অসামাজিক কাজের জন্য) সঙ্গীর ব্যবস্থা করে দিলে এক রাতের জন্য ৩ হাজার ৫০০ টাকা দিতে হবে বলেও জানান তিনি।

পুলিশি ঝামেলা হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের হোটেল ১০০% নিরাপদ। মেইন রোডের পাশে অবস্থিত। এখানে ঝামেলা-টামেলা হবে না। এটা পুরাতন হোটেল। যাদের নতুন হোটেল, তাদের কাগজপত্র থাকে না, তাদের সমস্যা হয়। এটা ১০০% সিকিউর হোটেল ভাই।

রাস্তায় পড়ে থাকা আরেকটি ভিজিটিং কার্ডের নম্বরে কল দিলে বাদশা ভাই নামে এক ব্যক্তি ফোন ধরেন এবং বিভিন্ন অফারের কথা জানান। তিনি বলেন, সব ধরনের মাল (মেয়ে) পাওয়া যায়, ভার্সিটির মেয়েও পাবেন, সম্পূর্ণ ঝামেলামুক্ত।

তবে টাকার বিষয়ে ফোনে কথা বলতে রাজি হননি তিনি। আশুলিয়ার বাইপাইলে এসে কল দিলে তিনি রিসিভ করবেন বলে জানান।

ভিজিটিং কার্ডে থাকা মুন স্টার নামের আরেকটি আবাসিক হোটেলে ফোন দিলে শুক্কুর আলী নামে এক ব্যক্তি বলেন, ভাই, আমরা সকল বিষয় খুবই যত্নশীল। পুলিশ, সাংবাদিকের ঝামেলা নাই। আর কোনো কথা থাকলে আমাদের হোটেলে আসেন, বাকি কথা এসে হবে। ফোনে এত কথা বলা যায় না। এরপরই তিনি কল কেটে দেন।

আবাসিক হোটেলের আশপাশের বাসিন্দারা জানান, আশুলিয়া থানা থেকে আধা কিলোমিটার থেকে দুই কিলোমিটারের মধ্যে অন্তত ৫/৬টি আবাসিক হোটেল ও গেস্ট হাউস রয়েছে। অথচ এসব গেস্ট হাউসে প্রতিনিয়ত অসামাজিক কার্যক্রম চলছে। মাঝে মাঝে পুলিশের অভিযানের কথা শোনা গেলেও তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ তাদের।

এ বিষয়ে নিরাপদ সড়ক চাই আশুলিয়া থানা কমিটির সভাপতি জি এম মিন্টু বলেন, আশুলিয়ার পল্লীবিদ্যুৎ, ডেন্ডাবর ও বাইপাইলসহ আশপাশের বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে প্রকাশ্যে অসামাজিক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চলছে। এতে স্থানীয় শিক্ষার্থী ও মা-বোনদের স্বাভাবিক চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে পুরো এলাকার আবাসিক পরিবেশ। অবিলম্বে এসব অবৈধ হোটেল বন্ধে কার্যকর অভিযান পরিচালনা এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানাচ্ছি।

সামাজিক পরিবেশ ও মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা ঢাকা জেলার সভাপতি নজরুল ইসলাম নিরব বলেন, এই বিষয়গুলোর প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। সেই সাথে আমরাও সামাজিকভাবে সচেতন হবো এবং এমন তথ্য পেলে অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবগত করতে হবে। অবিলম্বে এসব অবৈধ হোটেল বন্ধে কার্যকর অভিযান পরিচালনা করতে হবে এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানান তিনি।

এ বিষয়ে আশুলিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম বলেন, এই বিষয়গুলো আমরা বিভিন্ন জায়গা থেকে শুনতে পাচ্ছি এবং তথ্য সংগ্রহ করছি। এ ব্যাপারে আইন অনুযায়ী সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ সময় তিনি সংবাদকর্মীসহ সকলের সহযোগিতা আশা করেন।