...|...|...

রংপুর

যেভাবে তৈরি হলো ঐতিহ্যবাহী চিনি মসজিদ

নীলফামারী প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬, দুপুর ১২:১৩ | আপডেট: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ভোর রাত ৪:২০
Shares
যেভাবে তৈরি হলো ঐতিহ্যবাহী চিনি মসজিদ

নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা চিনি মসজিদ। ছবি: টাইমস টুডে

নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা চিনি মসজিদ শুধু একটি উপাসনালয় নয়, উত্তরাঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্থাপত্যশিল্পের এক অনন্য সাক্ষী। প্রায় ১৬৩ বছরের পুরোনো এই মসজিদ প্রতিদিন টানে দেশ-বিদেশের দর্শনার্থী, গবেষক, আলোকচিত্রী ও মুসল্লিদের। ব্যতিক্রমী নকশা, দৃষ্টিনন্দন কারুকাজ আর রঙিন চিনামাটির মোজাইকের জন্য এটি দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় ধর্মীয় স্থাপনায় পরিণত হয়েছে।

তবে মসজিদটির নাম নিয়ে এখনও অনেকের মধ্যে কৌতূহল রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, চিনি উৎপাদনের সাথে সম্পর্ক থাকায় এর নাম ‘চিনি মসজিদ’। কিন্তু বাস্তবে এর সাথে চিনির কোনো সম্পর্ক নেই। ‘চিনি’ শব্দটি এসেছে ‘চিনামাটি’ থেকে।

একসময় চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আনা পোর্সেলিনের প্লেট, কাপ, বাটি ও রঙিন সিরামিকের টুকরো দিয়ে মসজিদের দেয়াল, গম্বুজ, মিনার ও খিলান অলংকৃত করা হয়। সেই থেকেই মানুষের মুখে মুখে এর নাম হয়ে যায় ‘চিনি মসজিদ’।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৮৬৩ সালে হাজী বাকের আলী ও হাজী মুকু নামে দুই ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি সৈয়দপুরের ইসবাগ এলাকায় ছন ও বাঁশ দিয়ে একটি ছোট্ট মসজিদ নির্মাণ করেন। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় সেটি টিনের ঘরে রূপ নেয়। সময়ের সাথে মুসল্লির সংখ্যা বাড়তে থাকলে একটি স্থায়ী পাকা মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং এ জন্য গঠন করা হয় তহবিল।

১৯২০ সালে হাজী হাফিজ আবদুল করিমের উদ্যোগে মসজিদটির প্রথম পাকা অংশ নির্মিত হয়। তখন এর দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৪০ ফুট এবং প্রস্থ ৩৯ ফুট। নির্মাণকাজে কলকাতা থেকে আনা মার্বেল পাথরের পাশাপাশি চীন থেকে আমদানি করা চিনামাটি ব্যবহার করা হয়।

পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে মসজিদটির সম্প্রসারণের পাশাপাশি দেয়াল, গম্বুজ ও মিনারে যুক্ত হয় রঙিন চিনামাটি, সিরামিক ও মোজাইকের নান্দনিক অলংকরণ। ফুল, লতাপাতা ও জ্যামিতিক নকশার অপূর্ব সমন্বয় মসজিদটিকে দিয়েছে আলাদা সৌন্দর্য।

সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ চিনি মসজিদ দেখতে আসছেন। কেউ নামাজ আদায় করছেন, কেউ ইতিহাস জানছেন, আবার কেউ স্মৃতি ধরে রাখতে ছবি তুলছেন। শীতকাল, ঈদ এবং সরকারি ছুটির দিনগুলোতে দর্শনার্থীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

দিনাজপুরের খানসামা থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা নাজমুল হক বলেন, অনেকবার ছবিতে দেখেছি। কিন্তু সামনে এসে বুঝলাম, মসজিদটি সত্যিই অসাধারণ সুন্দর। চিনামাটির এমন কারুকাজ খুব কম জায়গাতেই দেখা যায়।

পার্বতীপুর থেকে আসা মাহফিজুল ইসলাম বলেন, চিনি মসজিদ শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অংশ। এখানে দর্শনার্থীদের জন্য তথ্যসমৃদ্ধ গাইড বা তথ্যকেন্দ্র থাকলে সবাই আরও ভালোভাবে এর ইতিহাস জানতে পারতেন।

চিনি মসজিদের খাদেম এরশাদুল হক বলেন, প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ চিনি মসজিদ দেখতে আসেন। শীতকালে বিদেশি পর্যটকদেরও দেখা মেলে। কেউ নামাজ আদায় করেন, কেউ আবার মসজিদের ইতিহাস ও চিনামাটির কারুকাজ দেখতে আসেন।

ঈদ ও সরকারি ছুটির দিনগুলোতে দর্শনার্থীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। আমরা সবাইকে মসজিদের পবিত্রতা বজায় রেখে ভ্রমণের অনুরোধ জানাই। এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সংরক্ষণে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।

সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারাহ ফাতেহা তাকলিমা বলেন, চিনি মসজিদ নীলফামারীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থাপনা। এর ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন সংশ্লিষ্ট দফতরের সাথে সমন্বয় করে কাজ করছে। এই স্থাপনাকে ঘিরে পর্যটনেরও ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।

ধর্মীয় গুরুত্ব, ঐতিহাসিক ঐতিহ্য এবং শিল্পসমৃদ্ধ স্থাপত্য এই তিনের অনন্য সমন্বয়ে চিনি মসজিদ আজও উত্তরবঙ্গের অন্যতম দর্শনীয় নিদর্শন। দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদ প্রতিদিনই চিনামাটির ঝলমলে কারুকাজে মুগ্ধ করছে অসংখ্য দর্শনার্থীকে। 

স্থানীয়দের বিশ্বাস, যথাযথ সংরক্ষণ, গবেষণা ও প্রচারের মাধ্যমে চিনি মসজিদ ভবিষ্যতে দেশীয় পর্যটনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছেও আরও পরিচিত ও আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে।