যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইতিহাস গড়েছেন মুসলিম আমেরিকান প্রার্থীরা। এবারের নির্বাচনে ফেডারেল, অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় পর্যায়ে অন্তত ৯৭ জন মুসলিম প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। আরও ১৫ জন প্রার্থী ভোট গণনায় এগিয়ে থাকায় বিজয়ীর সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
মুসলিম নাগরিক অধিকারবিষয়ক সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনসের (সিএআইআর) তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে প্রাথমিক বাছাই পর্ব পেরিয়ে ১৬৮ জন মুসলিম আমেরিকান প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তাঁদের মধ্যে ৯৭ জনের জয় নিশ্চিত হয়েছে, যা মধ্যবর্তী নির্বাচনে মুসলিম প্রার্থীদের জন্য নতুন রেকর্ড।
বিজয়ীদের মধ্যে সাতজন মার্কিন কংগ্রেসে যাচ্ছেন। তাঁদের ছয়জন প্রতিনিধি পরিষদে এবং একজন সিনেটে নির্বাচিত হয়েছেন। মিশিগান থেকে নির্বাচিত আব্দুল এল-সায়েদ যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন।
প্রতিনিধি পরিষদে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন ইলহান ওমর, রাশিদা তালিব, আন্দ্রে কারসন ও লতিফা সাইমন। তাঁদের সঙ্গে নতুন সদস্য হিসেবে যোগ দিচ্ছেন অ্যাডাম হামাউই ও ডারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ার।
এ ছাড়া অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে ৩৯টি পদে, কাউন্টি ও পৌর পর্যায়ে ১৬টি, শিক্ষা ও স্কুল বোর্ডে ২৭টি এবং বিচারক হিসেবে আটটি পদে মুসলিম প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন।
জয়ের নেপথ্যে কী?
মিডল ইস্ট আইয়ের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে জোহরান মামদানির ঐতিহাসিক জয় মুসলিম আমেরিকানদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণে নতুন অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। পাশাপাশি মুসলিমবিদ্বেষের বিরুদ্ধে অবস্থান, ফিলিস্তিনিদের অধিকার, অর্থনৈতিক সংকট এবং ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে খোলামেলা অবস্থান এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
সিএআইআরের নির্বাচন-পরবর্তী জরিপে অংশ নেওয়া মুসলিম ভোটারদের ৯৩ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা ভোট দিয়েছেন। ভোট দেওয়া উত্তরদাতাদের মধ্যে ৮০ শতাংশ ডেমোক্র্যাটদের এবং মাত্র ৬ শতাংশ রিপাবলিকানদের সমর্থন করেছেন।
জরিপে অংশ নেওয়া ৭০ শতাংশ মুসলিম জানিয়েছেন, ক্রমবর্ধমান মুসলিমবিদ্বেষ তাঁদের ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। অন্যদিকে ৭৬ শতাংশ গাজা ও ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকারকে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী ইস্যু হিসেবে উল্লেখ করেছেন। গাজায় ইসরায়েলের হামলা তাঁদের ভোটের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলেছে বলে জানিয়েছেন ৮০ শতাংশ।
জর্জিয়া ভোটার প্রজেক্টের যোগাযোগ পরিচালক উরুজ আলী মিডল ইস্ট আইকে বলেন, মুসলিম ভোটাররা এখন রাজনৈতিক দলের চেয়ে প্রার্থীদের নীতিগত অবস্থানকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এ কারণে অনেকেই নিজেদের ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান হিসেবে পরিচয় দেওয়ার পরিবর্তে স্বতন্ত্র ভোটার হিসেবে দেখছেন।
এবারের নির্বাচনে মুসলিম প্রার্থীদের ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশের বিষয়টিও ছিল উল্লেখযোগ্য। আব্দুল এল-সায়েদ তাঁর বিজয় ভাষণ শুরু করেন ‘ইনশাআল্লাহ’ ও ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে। নির্বাচনী প্রচারণায় নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস ও মূল্যবোধও প্রকাশ্যে তুলে ধরেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, মুসলিম আমেরিকানদের রাজনৈতিক সক্রিয়তা বাড়ার পেছনে তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, নাগরিক অধিকার ও পররাষ্ট্রনীতির মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
মুসলিম আমেরিকানস ইন পাবলিক সার্ভিসের চেয়ারম্যান আহমেদ মাতি বলেন, নির্বাচিত পদগুলোতে মুসলিমদের ক্রমবর্ধমান প্রতিনিধিত্ব দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্পৃক্ততা, অধ্যবসায় ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রতিফলন।
যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যায় মুসলিমদের অংশ তুলনামূলকভাবে কম হলেও এবারের নির্বাচনে তাঁদের রেকর্ডসংখ্যক জয় দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে।



