আইনি জটিলতা, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে কোটি কোটি টাকার আমানত এবং দীর্ঘদিনের বকেয়া রাজস্বের বোঝা নিয়ে চলছে পাঁচ তারকা মানের বিলাসবহুল হোটেল ‘প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও’ এবং এর স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠান হোটেল ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড (এইচআইএল)। সম্প্রতি টাইমস টুডের হাতে আসা অডিট রিপোর্ট বিশ্লেষণে এসব চিত্র উঠে এসেছে। অডিট রিপোর্টটি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস ফার্ম ‘হুদা ভাসী চৌধুরী অ্যান্ড কোং’ কর্তৃক পরিচালিত হয়েছে। এই স্বাধীন নিরীক্ষা (অডিট) প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন মুনাফায় ফেরার কিছু ইতিবাচক চিত্র উঠে আসলেও এর নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা বিশাল অঙ্কের আর্থিক ঝুঁকি ও আইনি বিরোধের বিষয়ও সামনে এসেছে।
লোকসান কাটিয়ে মুনাফায় প্রত্যাবর্তন
অডিট রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ হিসাব বছরে কোম্পানিটি কর-পরবর্তী নিট ৮ কোটি ৬২ লাখ ৭৮ হাজার টাকা মুনাফা অর্জন করেছে। অথচ আগের বছর (২০২৪ সালে) প্রতিষ্ঠানটি ৩ কোটি ৮৩ লাখ ৯৬ হাজার টাকার নিট লোকসানে ছিল। আলোচ্য বছরে হোটেলটির মোট রাজস্ব আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২১৭ কোটি টাকার বেশি , যা ২০২৪ সালে ছিল ১ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা। পরিচালন মুনাফায় এই ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও পেছনের আর্থিক ও আইনি চিত্র প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
কর ও ভ্যাট ঝুঁকি ঝুলে আছে
নথি বিশ্লেষণে উঠে এসেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও ভ্যাট কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন দাবির বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটির পুঞ্জীভূত সম্ভাব্য বা কন্টিনজেন্ট দায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মোট ৭১ কোটি ৭৪ হাজার ২০৩ টাকায়।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এইচআইএল-এর বকেয়া আয়কর দাবিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে জটিলতা। বিভিন্ন কর নির্ধারণী বছরে ডেপুটি কমিশনার অব ট্যাক্সেস (ডিসিটি)-এর দাবিকৃত সাধারণ সুদসহ প্রতিষ্ঠানটির মোট ৩৯ কোটি ৯৫ লাখ ৪৪ হাজার ৪১ টাকার বকেয়া আয়কর দাবি বর্তমানে হাইকোর্ট, কর আপিল ও ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে।
অন্যদিকে, সোনারগাঁও হোটেলের ভ্যাট সংক্রান্ত আইনি বিরোধ এখনো নিষ্পত্তির আলো দেখেনি। ভ্যাট কর্তৃপক্ষের দাবিকৃত রিট মামলা ও বিলম্বিত ভ্যাট পরিশোধের ওপর আরোপিত সুদ বাবদ হোটেলটির বিরুদ্ধে আরও ৩১ কোটি ৫ লাখ ৩০ হাজার ১৬২ টাকার সম্ভাব্য দায় ঝুলছে।
অবশ্য ভ্যাট কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত বকেয়া মেটাতে গত ২০২৪ সালে কিস্তিতে ২ কোটি ৭৩ লাখ টাকারও বেশি জমা দেওয়া হয়েছিল। তবে এই অর্থ জমা দেওয়ার পরও প্রতিষ্ঠান দুটির মূল বকেয়া ও দাবির এক বিশাল অংশ এখনো আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে ঝুলন্ত অবস্থায় রয়ে গেছে।
৭৩ কোটির বেশি এফডিআর ঝুঁকি
অডিট রিপোর্টে সবচেয়ে বড় আর্থিক ঝুঁকি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে ব্যাংকিং খাতের অস্থিতিশীলতার প্রভাব। বিভিন্ন তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কোম্পানির মোট ১ হাজার ৩৭০ কোটি টাকার স্বল্পমেয়াদী বিনিয়োগের পাশাপাশি ১৫৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকার ক্যাশ ও ব্যাংক ব্যালেন্স রয়েছে। তবে এর মধ্যে ৭৩ কোটি ৪৬ লাখ ২৭ হাজার টাকা এমন কিছু ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট হিসেবে সংরক্ষিত যেগুলো বর্তমানে গভীর আর্থিক ও নিয়ন্ত্রক সংকটের মুখোমুখি। এসব আমানতের আসল অর্থ ও মুনাফা শেষ পর্যন্ত কতটা উদ্ধার করা যাবে তা নিয়ে স্পষ্ট অনিশ্চয়তা প্রকাশ করেছেন নিরীক্ষকরা।
জমির মালিকানা ও হাতিরঝিল প্রকল্পের বিরোধ
কোম্পানির মোট ৮.০৫ একর জমির মূল স্বত্ব নিজেদের দাবি করলেও তেজগাঁও মৌজার প্রায় ১.৭৫ একর জমির সত্য ও দখল নিয়ে ভূমি আপিল বোর্ডে প্রশাসনিক মামলা (মামলা নং ৩-৪১/২০২৬) বিচারাধীন রয়েছে। অতীতে রাজউকের হাতিরঝিল উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে এই জমির ওপর থাকা হোটেলের কার পার্কিং ও অন্যান্য অবকাঠামো জোরপূর্বক ভেঙে ফেলা হয়। রাজউক পরবর্তীতে জমির ব্যবহার অনুমোদন বাতিল করলেও হোটেল কর্তৃপক্ষের আপিল ও আবেদনের বিষয়ে আজও চূড়ান্ত কোনো আইনি সুরাহা হয়নি।
অপারেটিং ব্যয় বৃদ্ধি ও ডব্লিউপিপিএফ তহবিলে বিলম্বে জমা
প্রতিবেদনে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, আলোচ্য বছরে কোম্পানির প্রপার্টি অপারেশন, রক্ষণাবেক্ষণ ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে প্রায় ১৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা এবং সাধারণ ও প্রশাসনিক খাতে ২২ কোটি ৪৭ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এর বাইরে বিপণন খাতে ব্যয় হয়েছে ৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা।
এদিকে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ২৩৪ ধারা লঙ্ঘন করে ২০২৪ অর্থবছরের শ্রমিক অংশীদারিত্ব তহবিল বা ডব্লিউপিপিএফ এর নির্ধারিত অর্থ নির্ধারিত ৯ মাসের সময়সীমার মধ্যে জমা দেয়নি কর্তৃপক্ষ। পরবর্তীতে আইনি বাধ্যবাধকতার মুখে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে গিয়ে সেই বকেয়া অর্থ জমা করা হয়।
ব্যবস্থাপনা চুক্তি ও শেয়ার মূলধন পুনর্গঠন
সিঙ্গাপুরের 'প্যান প্যাসিফিক হোটেলস অ্যান্ড রিসোর্টস পিটিই লিমিটেড'-এর সাথে প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের পরিচালন চুক্তির মেয়াদ ৩১ ডিসেম্বর ২০৩২ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হলেও ৩৯৯ জন স্থায়ী জনবল নিয়ে চলা এই প্রতিষ্ঠানের ক্যাপিটাল স্ট্রাকচারেও পরিবর্তন আসছে। কোম্পানির অনুমোদিত শেয়ার মূলধন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিটি শেয়ারের অভিহিত মূল্য ১০০ টাকা থেকে কমিয়ে ১০ টাকায় রূপান্তরের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, সোনারগাঁও হোটেল ও এইচআইএল তাদের মূল বাণিজ্যিক পরিচালন আয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর সংকেত দিলেও, অস্থিতিশীল ব্যাংকে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ আমানত পুনরুদ্ধার, এনবিআরের ৭১ কোটি টাকার রাজস্ব বিরোধ নিষ্পত্তি এবং মূল্যবান জমির আইনি স্বত্ব নিশ্চিত করতে না পারলে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থায়িত্ব বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়তে পারে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে হোটেল ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের সহকারী ব্যবস্থাপক (আভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা) সাফকাত আজিমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অর্থ বিভাগে কথা বলার জন্য বলেন। পরবর্তীতে অর্থ ও হিসাব বিভাগের উপ-ব্যবস্থাপক নাজিম উদ্দীন ভুঁইয়ার মোবাইলে ফোন করা হলে সাংবাদিক পরিচয় শোনামাত্রই তিনি ‘পরে কথা বলছি’ বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এরপর একাধিকবার চেষ্টা করেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

