হঠাৎ জানতে পারলেন আপনার নামে থানায় বা আদালতে একটি মামলা হয়েছে, যে ঘটনার বিষয়ে আপনি কিছুই জানেন না। শত্রুতা বা হয়রানি করার উদ্দেশে এমন মিথ্যা মামলা দেওয়ার ঘটনা আমাদের সমাজে অহরহ ঘটে। মামলার কথা শুনলেই অনেকে ভয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান বা ফোন বন্ধ করে আত্মগোপন করেন। কিন্তু মনে রাখবেন, না জেনে পালিয়ে যাওয়া মানেই নিজেকে আইনের চোখে পরোক্ষভাবে দোষী হিসেবে উপস্থাপন করা
আইন কী বলে?
ফৌজদারি কার্যবিধি - ধারা ১৫৪: আমলযোগ্য অপরাধের খবর থানায় লিখে নেওয়া হলে সেটিকে এজাহার বা FIR বলা হয়। তাই শুধু কারও মুখের কথা বিশ্বাস করবেন না। থানা, মামলা নম্বর, তারিখ, কোন ধারা দেওয়া হয়েছে এবং এজাহারে কী লেখা আছে - এসব আগে জানুন।
ধারা ৪৯৬-৪৯৮: কোন অপরাধে সহজে জামিন হয় আর কোনটিতে আদালতের বিচার দরকার - তা মামলার ধারার ওপর নির্ভর করে। উপযুক্ত ঘটনায় দায়রা আদালত বা হাইকোর্ট বিভাগ আগাম জামিনের আবেদনও বিবেচনা করতে পারেন। কোন পথটি ঠিক সেটি আইনজীবী বলবেন।
দণ্ডবিধি - ধারা ২১১: কাউকে ক্ষতি করার জন্য জেনেশুনে ভিত্তিহীন ফৌজদারি অভিযোগ দেওয়া নিজেই অপরাধ হতে পারে। তবে অভিযোগটি সত্যিই মিথ্যা ছিল - এ কথা প্রমাণের জন্য মূল মামলার নথি ও ফল খুব গুরুত্বপূর্ণ।
সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২: সিসিটিভি, মোবাইলের অবস্থান, কলের তথ্য, যাতায়াতের টিকিট, অফিস হাজিরা, ছবি ও সাক্ষী আপনার অবস্থান প্রমাণে কাজে লাগতে পারে। ডিজিটাল ফাইল কাটাছেঁড়া না করে মূল অবস্থায় রাখুন।
প্রথমেই আপনার করণীয়
বাংলাতে মামলার সঠিক তথ্য নিন: থানা ও আদালত থেকে মামলা নম্বর, তারিখ, ধারাগুলো এবং অভিযোগে বলা সময়-স্থান জেনে নিন। ফেসবুক পোস্ট বা ফোনের কথাকে একমাত্র তথ্য ভাববেন না।
আইনজীবীকে কিছু লুকাবেন না: আগের ঝগড়া, টাকা-পয়সা, সম্পর্ক বা যোগাযোগের ইতিহাস খুলে বলুন। এজাহার দেখে তিনি আত্মসমর্পণ, নিয়মিত জামিন বা আগাম জামিনের সঠিক পথ বুঝিয়ে ফৌজদারি দেবেন।
আপনি কোথায় ছিলেন তার প্রমাণ রাখুন: সিসিটিভি, টিকিট, অফিস হাজিরা, লেনদেন, মোবাইলের প্রমাণ অবস্থান, ছবি ও নিরপেক্ষ সাক্ষীর নাম দ্রুত সংগ্রহ করুন। মূল ফাইল এডিট করবেন না।
ঘটনার সময়রেখা লিখুন: বিরোধের শুরু থেকে মামলা হওয়ার দিন পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তারিখ ধরে এক পাতায় লিখুন। প্রতিটি কাগজের কপি আইনজীবীকে দিন, মূল কাগজ নিরাপদে রাখুন।
আদালতের নিয়ম মানুন: জামিন পেলে হাজিরার তারিখ ও আদালতের সব শর্ত মেনে চলুন। । তদন্তকারী ডাকলে আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে সহযোগিতা করুন।
যে ভুলগুলো কখনোই করবেন না
লুকিয়ে থাকা: পালিয়ে থাকলে আদালতের সহায়তা নিতে দেরি হয় এবং আপনার আচরণ ব্যাখ্যা করা কঠিন হতে পারে।
অভিযোগকারীকে ভয় দেখানো: ফোন, লোক পাঠানো বা সাক্ষীকে চাপ দিলে নতুন মামলা হতে পারে এবং জামিনও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
মামলার কাগজ অনলাইনে ছড়ানো: সাক্ষী বা ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করলে তদন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং নতুন আইনি সমস্যা তৈরি হতে পারে।
ভুয়া প্রমাণ বানানো: সাজানো স্ক্রিনশট, মিথ্যা সাক্ষী বা নকল রসিদ পুরো মামলায় আপনার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করবে।
প্রতিকার ও অভিযোগের স্থান: প্রথম কাজ হলো আইনজীবীর মাধ্যমে উপযুক্ত আদালতে জামিন ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষা চাওয়া। আপনার নির্দোষতার প্রমাণ তদন্তকারীকে লিখিতভাবে দেওয়া যায়; জমা দেওয়ার প্রমাণ রাখুন। মামলার অবস্থার ওপর ভিত্তি করে অব্যাহতি, খালাস বা উচ্চ আদালতের অন্য প্রতিকার চাওয়া যেতে পারে। পরে যদি স্পষ্ট হয় যে আপনাকে ক্ষতি করার জন্য জেনেশুনে মিথ্যা অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল, তখন দণ্ডবিধির ধারা ২১১ বা অন্য আইনি ব্যবস্থার বিষয়ে পরামর্শ নিন। টাকা না থাকলে ১৬৬৯৯ নম্বরে সরকারি আইনি সহায়তা চাইতে পারেন।

