...|...|...

অন্যান্য

মানুষের আত্মার ওজন কত?

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, রাত ১০:২০
Shares
মানুষের আত্মার ওজন কত?

প্রতীকী ছবি।

মৃত্যুর পর মানুষের আত্মা শরীর ছেড়ে চলে যায় কি না, তা নিয়ে বহু যুগ ধরেই বিতর্ক রয়েছে। ধর্মীয় বিশ্বাসে আত্মার ধারণা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর অস্তিত্ব বা ওজন পরিমাপের কোনো স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নেই। তবে ১৯০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এক চিকিৎসক দাবি করেছিলেন, মৃত্যুর মুহূর্তে মানুষের শরীর থেকে আত্মা বেরিয়ে যাওয়ার সময় ওজন কমে যায় ২১ গ্রাম। তার এই পরীক্ষা পরে ‘২১ গ্রাম পরীক্ষা’ নামে পরিচিতি পায়।

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের হ্যাভারহিলে কর্মরত চিকিৎসক ডানকান ম্যাকডুগাল মৃত্যুপথযাত্রী কয়েকজন মানুষের ওজন পর্যবেক্ষণ করে আত্মার ওজন নির্ধারণের চেষ্টা করেছিলেন। তার গবেষণার বিবরণ প্রকাশিত হয় ‘American Medicine’ সাময়িকীতে।

কীভাবে হয়েছিল ২১ গ্রাম পরীক্ষা?

ম্যাকডুগাল পরীক্ষার জন্য একটি নার্সিং হোমে থাকা ছয়জন মৃত্যুপথযাত্রীকে বেছে নেন। তাদের মধ্যে চারজন যক্ষ্মায় এবং একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন। ষষ্ঠ ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ গবেষণায় উল্লেখ করা হয়নি।

মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে রোগীদের বিছানাসহ একটি বিশেষ ওজন মাপার যন্ত্রে রাখা হয়। ম্যাকডুগালের উদ্দেশ্য ছিল, মৃত্যুর ঠিক আগে ও পরে শরীরের ওজনের কোনো পরিবর্তন ঘটে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা।

তার দাবি অনুযায়ী, একজন রোগীর মৃত্যুর মুহূর্তে শরীরের ওজন ২১ দশমিক ৩ গ্রাম কমে যায়। এই পরিবর্তনকেই তিনি আত্মা শরীর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাব্য প্রমাণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

তবে বাকি পাঁচজনের পরীক্ষায় একই রকম ফল পাওয়া যায়নি। একজনের ওজন প্রথমে কমলেও পরে আবার বেড়ে যায়। অন্য দুজনের ক্ষেত্রেও প্রথমে ওজন কমার পর তা আরও বেড়ে যায়। আরেকটি পরীক্ষায় ওজন মাপার যন্ত্রের সমন্বয় ঠিক ছিল না। ষষ্ঠ রোগীর মৃত্যু হয় যন্ত্রের পরিমাপ ঠিক করার সময়।

অর্থাৎ, ছয়জনের মধ্যে মাত্র একজনের পরীক্ষার ফলকে ম্যাকডুগাল তার ধারণার পক্ষে ব্যবহার করেছিলেন। এত অল্পসংখ্যক পরীক্ষার ভিত্তিতে আত্মার ওজন সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

কুকুরের ওপরও পরীক্ষা চালান চিকিৎসক

মানুষের ওপর পরীক্ষা চালানোর পর ম্যাকডুগাল ১৫টি কুকুরের ওপর একই ধরনের পরীক্ষা করেন। তার দাবি, কুকুরের মৃত্যুর সময় ওজনে কোনো পরিবর্তন ধরা পড়েনি। এ থেকে তিনি ধারণা করেন, মানুষের আত্মা থাকলেও কুকুরের আত্মা নেই।

কিন্তু এই সিদ্ধান্তের পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছিল না। পরীক্ষায় ওজনের পরিবর্তন না পাওয়া মানেই কোনো প্রাণীর আত্মা নেই- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

কেন প্রশ্নবিদ্ধ এই গবেষণা?

গবেষণাটির অন্যতম দুর্বলতা ছিল নমুনার সংখ্যা। মাত্র ছয়জন মানুষের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে মানুষের আত্মার ওজন সম্পর্কে সাধারণ সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। মৃত্যুর সময় শরীরে শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন, আর্দ্রতা বা অন্যান্য কারণে ওজনের সামান্য হেরফের হতে পারে। এসব সম্ভাবনাকে নির্ভরযোগ্যভাবে আলাদা করার মতো পরীক্ষাপদ্ধতিও ওই গবেষণায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

এ ছাড়া অন্য গবেষকেরা একই পরীক্ষা পুনরায় চালিয়ে ম্যাকডুগালের ফল নিশ্চিত করতে পারেননি। বিজ্ঞানে কোনো দাবিকে নির্ভরযোগ্য হিসেবে গ্রহণ করার জন্য পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার ফল স্বাধীনভাবে পুনরায় যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।

জনপ্রিয়তা আছে, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই

ম্যাকডুগালের পরীক্ষা পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞান, দর্শন ও জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। ২০০৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘21 Grams’ চলচ্চিত্রের নামও এই ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত।

তবে কোনো ধারণা জনপ্রিয় হলেই তা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়ে যায় না। মানুষের আত্মার ওজন ২১ গ্রাম- এমন দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

মৃত্যুর পর আত্মার অস্তিত্ব নিয়ে ধর্মীয় ও দার্শনিক বিশ্বাসের নিজস্ব পরিসর রয়েছে। কিন্তু সেই বিশ্বাসকে পরীক্ষাগারে যাচাইযোগ্য বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করতে হলে প্রয়োজন আরও কঠোর পদ্ধতি, নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং পুনরাবৃত্ত পরীক্ষার ফল।