...|...|...

সারাদেশ

মানিক পশারীর কবর খোঁড়ার ছবি ভাইরাল, তিন নারীকে নিয়ে যা জানা গেল

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, রাত ১০:০০
Shares
মানিক পশারীর কবর খোঁড়ার ছবি ভাইরাল, তিন নারীকে নিয়ে যা জানা গেল

ছবি: সংগৃহীত

পিরোজপুরে প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফনকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। ছবিতে তিন নারীকে কবর খোঁড়ার কাজে অংশ নিতে দেখা যায়। তবে তারা একাই কবর খুঁড়েছেন-এমন দাবির সাথে স্থানীয় গ্রাম পুলিশ ও পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যের মিল পাওয়া যায়নি।

মানিক পশারী জামায়াতে ইসলামীর প্রয়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মামলার বাদী ছিলেন। তার দাফন ও রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদানকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে উত্তেজনা তৈরি হয় বলে পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ।

ঘটনার বিষয়ে স্থানীয় গ্রাম পুলিশ, পরিবারের সদস্য, পুলিশ ও জামায়াত নেতাদের বক্তব্যে কিছু বিষয়ে ভিন্নতা পাওয়া গেছে।

স্থানীয় গ্রাম পুলিশ মতিউর রহমান জানান, গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) দুপুরে মানিক পশারীর বাড়ির কাছে প্রথমে কবর খোঁড়া হয়। তবে মাগরিবের পর একদল লোক কবরটি মাটি দিয়ে ভরাট করে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে রাত সাড়ে ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে পুনরায় কবর খোঁড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

মতিউর রহমানের ভাষ্য, কবর খোঁড়ার সরঞ্জাম আনতে তিনি মানিক পশারীর এক বোনের বাড়িতে যান। পরে ওই বোনসহ আরও দুই নারী সেখানে আসেন। তিনি কবর খোঁড়ার জন্য লোক খুঁজতে গেলে নারীরা মাটি সরানোর কাজে সহায়তা করেন। এ সময়ের ছবিই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

তিনি দাবি করেন, কবর খোঁড়ার কাজে তিনি ও স্থানীয় আরেক ব্যক্তি অংশ নেন। ফলে তিন নারী একাই কবর খুঁড়েছেন-এমন দাবি সঠিক নয়।

মতিউর রহমান আরও জানান, দাফনের সময় পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তিনজন গ্রাম পুলিশ ও স্থানীয় দুই ব্যক্তির সহায়তায় দাফন সম্পন্ন হয়। তার দাবি, দাফনের সময় আশপাশে কোনো নারীকে তিনি দেখেননি।

মানিক পশারীর বোন হেনা পশারী জানান, প্রথমবার কবর খোঁড়ার সময় পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় অন্য লোকজনও উপস্থিত ছিলেন। তবে সন্ধ্যার পর কবর ভরাট ও হুমকির ঘটনার পর অনেকে ভয়ে সেখান থেকে চলে যান।

হেনা পশারীর অভিযোগ, জামায়াত-শিবিরের লোকজন এসে কবর ভরাট করে দেন। তাদের মিছিল করে মানিক পশারী ও তার ছেলের কবরেও জুতা মারার কথা বলা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার অভিযোগ তুলে কবর ভরাটের হুমকি দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, মানিক পশারীর ছোট মেয়ে ও তারা দুই বোন কবর খোঁড়ার কাজে অংশ নেন। তাদের সাথে আরও দুজন পুরুষ ছিলেন। পরে রাতে প্রশাসনের লোকজন এসে তার ভাইকে দাফন করেন।

পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের উপস্থিতিতে মানিক পশারীর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দাফনের সময় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি এবং শান্তিপূর্ণভাবে দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে।

অন্যদিকে, কবর ভরাটের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পিরোজপুর জেলা জামায়াতের নেতারা। জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক মানিক পশারীকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ দাবি করে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়ার বিরোধিতা করার কথা জানিয়েছেন। তবে দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।

মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়েও স্থানীয় কয়েকজনের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম বাতেন দাবি করেন, সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার পর পুরস্কার হিসেবে মানিক পশারীকে মুক্তিযোদ্ধা করা হয়েছিল। সাঈদী সম্পর্কে তার বক্তব্যও ছিল ভিন্নমতপূর্ণ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় আরেক মুক্তিযোদ্ধা দাবি করেন, সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলায় মানিক পশারী মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছিলেন এবং পরে তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তার বক্তব্য অনুযায়ী, মানিক পশারী সরকারি গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা হওয়ায় মৃত্যুর পর নিয়ম অনুযায়ী তাকে গার্ড অব অনার দেওয়ার কথা ছিল। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি বা স্বাধীন যাচাইয়ের তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।

মানিক পশারী পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ছিলেন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ে ও জামাতার বাড়িতে আশ্রয়ে ছিলেন। গত দুই মাস ধরে তিনি অসুস্থতায় ভুগছিলেন।

গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকালে টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ে-জামাতার বাড়িতে ৮৭ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। পরে দুপুরে লাশ পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে আনা হয়।

গার্ড অব অনার ও দাফন নিয়ে জটিলতার মধ্যে বিকেলে পুলিশ লাইনসে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। পরে রাত ১টার দিকে লাশ নিজ বাড়িতে নেওয়া হয় এবং রাত ১টা ২০ মিনিটের দিকে দাফন সম্পন্ন হয়।