গাজীপুরের টঙ্গীতে একটি মাদ্রাসায় সাত বছর বয়সী এক শিশুশিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় মাদ্রাসার ভাইস প্রিন্সিপাল মোসলেম আহম্মদ (৩০) গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। শনিবার (২৪ অক্টোবর) তদন্তের অংশ হিসেবে মাদ্রাসা থেকে সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে পুলিশ। অন্যদিকে, ভুক্তভোগী শিশুর জবানবন্দি রেকর্ড করেছেন আদালত।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে শিশুটির জবানবন্দি নেওয়া হয়। গত বৃহস্পতিবার অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান বলেন, ‘শিশুটি গত বৃহস্পতিবার গাজীপুর মহানগর হাকিম আদালতে বিচারকের কাছে জবানবন্দি দিয়েছে। একই দিন শিক্ষককে শিশুটির বাবার করা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হলে বিচারক কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।’
পুলিশ জানায়, শনিবার দুপুরে তদন্তের জন্য মাদ্রাসায় যান কর্মকর্তারা। সেখান থেকে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়। এ ছাড়া ঘটনার সময় উপস্থিত ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে শিশুটিকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ওসি আরিফুর রহমান বলেন, ‘আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছি। এতে প্রাথমিকভাবে ঘটনার সত্যতা (শিশুকে নিপীড়ন করা হয়েছে) পাওয়া গেছে। এখনও তদন্ত চলমান আছে।’
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৯ অক্টোবর টঙ্গীর ওই মাদ্রাসার নিচতলার সিঁড়িতে প্রথম শ্রেণির এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়ন করা হয় বলে অভিযোগ করে তার পরিবার। ঘটনার পর শিশুটি মাদ্রাসায় যেতে চাইছিল না। পরিবারের সদস্যরা কারণ জানতে চাইলে প্রথমে সে কিছু বলেনি। পরে মা-বাবার জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার কথা জানায়।
এরপর ২১ অক্টোবর দুপুরে শিশুটির স্বজনেরা মাদ্রাসায় গিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষককে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয় লোকজনও সেখানে জড়ো হন। একপর্যায়ে শিক্ষককে মারধর করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। এ ঘটনায় শিশুটির বাবা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন।
অভিযুক্ত শিক্ষককে জিজ্ঞাসাবাদ ও মারধরের ঘটনার কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। একই ঘটনায় মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও শিশুটির পরিবারের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ সামনে এসেছে।
মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ আলমাছ হোসেনের অভিযোগ, শিশুটির বাবার নেতৃত্বে ১৫ থেকে ১৬ জনের একটি দল প্রতিষ্ঠানে ঢুকে শিক্ষককে মারধর করে। তাকে রক্ষা করতে গেলে অন্য শিক্ষক-শিক্ষিকা ও নিরাপত্তাকর্মীরাও মারধরের শিকার হন। এ সময় মাদ্রাসার কার্যালয় ভাঙচুর করা হয় এবং ১৭ লাখ টাকা ও পাঁচটি মুঠোফোন লুট করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এসব অভিযোগে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ থানায় পৃথক অভিযোগ দিয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শিশুটির বাবা। তার দাবি, মেয়ের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার চাইতেই তিনি মাদ্রাসায় গিয়েছিলেন, কোনো ধরনের মব সৃষ্টি করতে নয়। মাদ্রাসায় ভাঙচুর এবং ১৭ লাখ টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেছেন।
শুক্রবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে কথা বলেন শিশুটির বাবা। এ সময় নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি মেয়ের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন তিনি। একই সাথে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা চেয়েছেন ওই বাবা।
মামলার বরাতে পুলিশ জানায়, সোমবার মাদ্রাসার ভেতরে প্রথম শ্রেণির ওই ছাত্রীকে যৌন নিপীড়ন করেন শিক্ষক মোসলেম উদ্দিন। ঘটনার পর বিষয়টি কাউকে না জানানোর জন্য শিশুটিকে মারধরের হুমকি দেন তিনি। এ কারণে শিশুটি আতঙ্কিত হয়ে টানা তিন দিন মাদ্রাসায় যাওয়া বন্ধ করে দেয়। পরে পরিবারের সদস্যরা জানতে চাইলে তাদের কাছে শারীরিক হেনস্থার কথা প্রকাশ করে শিশুটি। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।


