সিলেটের বিদায়ী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সারওয়ার আলমের মাজার তহবিলে ৫ লাখ টাকা দান করা এবং এর আগের ও পরের নানা নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহ সিলেটে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। সচেতন মহলের মতে, মাজারটি ভক্তদের দেওয়া দানে এমনিতেই আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী। এমন পরিস্থিতিতে বিদায়ের প্রাক্কালে জেলা প্রশাসনের তহবিল থেকে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ দান করাকে অনেকেই 'পলিটিক্যাল স্ট্যান্টবাজি' বা সস্তা প্রচারণা হিসেবে দেখছেন।
সংক্ষুব্ধ নাগরিক আন্দোলনের সিলেটের সমন্বয়ক আবদুল করিম চৌধুরী এ বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিদায়ী ডিসি মাজারবিরোধী কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক তৈরি করার পরই বদলি হন। যেখানে মাজারের বাক্সের টাকা গুনে তিনিই দেখালেন যে সেখানে প্রচুর অর্থ আসে, সেখানে যাওয়ার আগে জেলা প্রশাসনের তহবিল থেকে ৫ লাখ টাকা দেওয়া পুরোপুরি একটি রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি।
এর আগে গত শুক্রবার (১২ জুন) হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার পরিদর্শনে যান তৎকালীন ডিসি সারওয়ার আলম। সেখানে তিনি মাজারের আয়-ব্যয়ের হিসাব ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনার ঘোষণা দেন।
এরই ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) বিকেলে মাজারে নতুন চারটি দানবাক্স স্থাপন করা হয় এবং মাজারের ঐতিহাসিক তিনটি দানের ডেক ও একটি পুরোনো দানবাক্স সিলগালা করে দেওয়া হয়।
৭০০ বছরের ইতিহাসে মাজারের দানের ডেক সিলগালা করার এই ঘটনাটি সিলেটে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে এবং জেলা প্রশাসকের এই উদ্যোগের পক্ষে-বিপক্ষে সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র মতভেদ দেখা দেয়।
কেউ কেউ একে ইতিবাচক বললেও, অনেকেই মাজারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রশাসনের এমন হস্তক্ষেপে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই গত রবিবার (২১ জুন) বিকেলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে ডিসি সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহারের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
তবে এই আদেশের পরপরই আবার তার পুনর্বহালের দাবিতে কিছু সংগঠন বিক্ষোভও প্রদর্শন করে।
প্রত্যাহারের আদেশ আসার পরদিন সোমবার (২২ জুন) ডিসি সারওয়ার আলম পুনরায় মাজারে যান এবং তার নির্দেশনায় সিলগালা করা ডেক ও দানবাক্সগুলো খোলা হয়।
দীর্ঘ গণনার পর জানা যায়, আটটি ডেক ও দানবাক্স থেকে সর্বমোট ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা নগদ, ৭ আনা স্বর্ণালংকার ও ১০ সৌদি রিয়াল পাওয়া গেছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ মাজারের নামে সোনালী ব্যাংকের কোর্ট বিল্ডিং শাখায় একটি নতুন হিসাব খুলে জমা করা হয়। টাকা গণনার আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেই ডিসি সারওয়ার আলম জেলা প্রশাসনের তহবিল থেকে মাজারের ওই নতুন ব্যাংক হিসাবে আরও ৫ লাখ টাকা অনুদান হিসেবে জমা দেন এবং সেই রাতেই দায়িত্ব হস্তান্তর করে পরদিন মঙ্গলবার (২৩ জুন) সিলেট ত্যাগ করেন।
সিলেটের সচেতন নাগরিকদের মতে, দেশ-বিদেশ থেকে আসা ভক্তদের দানে মাজারের তহবিল সবসময়ই সমৃদ্ধ থাকে। ইতিহাসের প্রথমবার এই টাকা প্রকাশ্যে গণনার পর যখন প্রমাণিত হলো যে সেখানে মোটা অঙ্কের টাকা জমা হয়, তখন জেলা প্রশাসনের সরকারি তহবিল থেকে আরও ৫ লাখ টাকা দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতাই ছিল না।
এই অর্থ অন্য কোনো জনকল্যাণমূলক বা দুস্থদের খাতে ব্যয় করা যেত। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বুধবার (২৪ জুন) সন্ধ্যায় সারওয়ার আলমের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ততা দেখিয়ে বিস্তারিত কথা বলতে রাজি হননি, তবে জেলা প্রশাসনের তহবিল থেকে মাজার তহবিলে ৫ লাখ টাকা দেওয়ার বিষয়টি তিনি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছিলেন।
উল্লেখ্য, গত বছরের ১৮ আগস্ট সিলেটের ডিসি হিসেবে নিয়োগ পাওয়া সারওয়ার আলম এর আগে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের একান্ত সচিব ছিলেন। সিলেটের ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর লুট ও চুরির ঘটনার তীব্র সমালোচনার মুখে তৎকালীন ডিসিকে সরিয়ে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি নগরের ফুটপাত উচ্ছেদ এবং ওসমানী মেডিকেল কলেজে দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধে কিছু প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিছু ক্ষেত্রে সফল ও কিছু ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলেও, মাজারের ঐতিহাসিক ডেক সিলগালা করার ঘটনাটি তার পুরো মেয়াদকালের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয়ে পরিণত হয়।

