মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বিদেশি সামরিক উপস্থিতি ছাড়াই আঞ্চলিক দেশগুলোর নেতৃত্ব চায় ইরান। এ লক্ষ্যে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে আলোচনা অব্যাহত রেখেছে তেহরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তার দায়িত্ব ওই অঞ্চলের দেশগুলোর হাতেই থাকা উচিত।
মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আরাঘচি জানান, গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) সদস্য দেশগুলোর প্রতি ইরানের কোনো শত্রুতা নেই। কাতার ও ওমানের ইতিবাচক ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গেও তেহরানের সংলাপ চলছে।
আরাঘচি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য হলো—অঞ্চলের দেশগুলোর নিজেদের উদ্যোগে এমন একটি নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে কোনো বিদেশি সামরিক উপস্থিতি থাকবে না।”
সোমবার (২ নভেম্বর) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম চ্যানেল আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, সম্প্রতি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রতিনিধি দল তেহরান সফরকালে নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে আলোচনা করেছে। রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোই এসব আলোচনার মূল লক্ষ্য। চারটি দেশই বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বন্ধুত্বপূর্ণ উপসাগরীয় দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার কোনো ইচ্ছা তেহরানের নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ইরানে হামলা চালালে ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও অন্যান্য স্থাপনা ইরানের প্রতিক্রিয়ার আওতায় আসবে বলে সতর্ক করেন তিনি।
নতুন কোনো সংঘাত এড়াতে উপসাগরীয় দেশগুলোকে সহায়তা করার আহ্বান জানান আরাঘচি। একই সঙ্গে কাতারের মধ্যস্থতার উদ্যোগ এবং ওমান ও সৌদি আরবের অবস্থানের প্রশংসা করেন তিনি।
সাক্ষাৎকারে কাতারের মধ্যস্থতায় তৈরি হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার একটি প্রস্তাবের কথাও জানান আরাঘচি। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের দাবিগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। এরপরের দিনই গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ খুলে দেওয়া হবে।
ইরানের দাবির মধ্যে রয়েছে—ইসলামাবাদ সমঝোতার পর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, সামুদ্রিক অবরোধ তুলে নেওয়া, ইরানের তেল রপ্তানির সুযোগ নিশ্চিত করা, জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করা এবং ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে আগের পর্যায়ে ফিরিয়ে নেওয়া।
আরাঘচি বলেন, এসব শর্ত পূরণ হলে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার দিনই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে আলোচনার পথ তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও জানান, কাতারের মধ্যস্থতায় নিউইয়র্কে মার্কিন প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে ইরানের পরোক্ষ আলোচনার একটি পর্ব অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে কাতার, তুরস্ক বা অন্য কোথাও সরাসরি আলোচনার বিষয়ে কোনো সমঝোতা হয়েছে—এমন খবর নাকচ করেন তিনি।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করেন, হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার আলোচনা এবং দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যৎ সমঝোতা আলাদা বিষয়। পারমাণবিক ইস্যুতে দেওয়া প্রস্তাবগুলো এখনো বিবেচনাধীন রয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পরোক্ষ কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই জানান, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান চলছে।
বাকাই বলেন, ইরানের সংশোধিত সাত ধাপের কূটনৈতিক প্রস্তাব দুই দিনের মধ্যেই পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব। হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা পুনরুদ্ধারের অগ্রগতি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করছে বলেও জানান তিনি। এ জন্য ওয়াশিংটনকে নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং জব্দকৃত ইরানি সম্পদ মুক্ত করতে হবে।
তেহরান কূটনীতির পথ খোলা রাখার কথা জানালেও নতুন করে কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে তার জবাব দিতে সশস্ত্র বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে বলে সতর্ক করেছে।


